মিয়ানমারে পাচারের সময় কোস্ট গার্ডের জব্দ করা সরকারি আলামত হিসেবে সংরক্ষিত ৪৫০ বস্তা ডিএপি সারের একটি অংশ অবৈধভাবে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের কয়েক সদস্যের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, জব্দ তালিকাভুক্ত সার থেকে ৯০ বস্তা গোপনে কর্ণফুলীর জুলধা এলাকার এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়। পরে সেই সার মিনি ট্রাকে করে সরিয়ে নেয়ার সময় কর্ণফুলী থানার পুলিশ ট্রাকসহ ৫০ বস্তা সার জব্দ করলে পুরো ঘটনা সামনে আসে।
এ ঘটনায় শুধু সার পাচার নয়; বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে থাকা জব্দ আলামতের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে কোস্ট গার্ডের অভিযানে উদ্ধার হওয়া সরকারি আলামত কিভাবে পুলিশি হেফাজত থেকে বের হলো, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোস্ট গার্ড জব্দ করার পর সারগুলো তখনও কার্গো বোটেই সংরক্ষিত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে মালামাল হস্তান্তর বা গুদামজাত করার আগেই নৌযান থেকে ধাপে ধাপে সার বের করে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পতেঙ্গা থানাধীন কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীর, ফাঁড়ির দ্বিতীয় কর্মকর্তা এএসআই শম্ভু নাথ এবং আনোয়ারার রাঙ্গাদিয়া ফাঁড়ি ও কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির সাথে সংশ্লিষ্ট কথিত ‘ক্যাশিয়ার’ কনস্টেবল আলাউদ্দিনের যোগসাজশে জব্দ করা সার থেকে ৯০ বস্তা কর্ণফুলীর জুলধা এলাকার মো: মনিরের কাছে বিক্রি করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, পুরো লেনদেনের সমন্বয়কের ভূমিকায় ছিলেন কনস্টেবল আলাউদ্দিন।
এরপর মনির একটি মিনি ট্রাকে করে সারগুলো সরিয়ে নেয়ার সময় কর্ণফুলী থানার শাহমীরপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো: শফি উল্লাহ জুলধা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ট্রাকসহ ৫০ বস্তা সার আটক করেন। ঘটনার পর বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ ও তৎপরতা শুরু হয়। পরে কর্ণফুলী থানায় মনির ও রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলা হওয়ার আগে রেজাউল নামে এক ব্যক্তিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
প্রশ্ন উঠেছে, কোস্ট গার্ডের জব্দ করা ৪৫০ বস্তা সার গ্রহণ, সংরক্ষণ ও পাহারার দায়িত্বে কারা ছিলেন? জব্দ তালিকার সাথে বর্তমানে থাকা সারের পরিমাণ মিলিয়ে দেখা হয়েছে কি-না? যদি ৯০ বস্তা সার সত্যিই বাইরে চলে গিয়ে থাকে, তাহলে তা একদিনে সম্ভব নয়; বরং এর পেছনে সঙ্ঘবদ্ধভাবে দায়িত্বে অবহেলা কিংবা যোগসাজশ ছিল কি-না, সেটিও তদন্তে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
উল্লেখ্য, গত ৩১ জুলাই সকাল ১০টার দিকে পতেঙ্গার ১৫ নম্বর ঘাটসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মিয়ানমারে পাচারের সময় প্রায় ১৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের ৪৫০ বস্তা (২২ হাজার ৫০০ কেজি) ডিএপি সার ও পাচারে ব্যবহৃত একটি কার্গো বোট জব্দ করে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। একই অভিযানে ২৩ জনকে আটক করা হয় এবং এ ঘটনায় পতেঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
জব্দ অভিযানের কয়েক দিনের মধ্যেই সেই সারের একটি অংশ বিক্রির অভিযোগ সামনে আসায় পুরো ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জব্দ আলামত থেকে যদি কোনো অংশ বিক্রি হয়ে থাকে, তাহলে এটি শুধু চুরি বা আত্মসাতের ঘটনা নয়; বরং বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট করারও শামিল।
অভিযোগ অস্বীকার করে কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীর বলেন, ‘সারগুলো যেভাবে জব্দ করা হয়েছিল, সেভাবেই আছে। বিক্রির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পারভেজ আলী বলেন, ‘জব্দ করা সার বিক্রির অভিযোগ আমরা গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করব। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে মনির ও রেজাউল করিমের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তদন্তে অন্য কারো নাম এলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।’
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বন্দর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো: আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার সাথে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তদন্তে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের মতে, ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে শুধু মামলার আসামিদের নয়; বরং জব্দ তালিকা, আলামত সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা সদস্যদের ডিউটি রোস্টার, কার্গো বোটের পাহারার নথি, সিসিটিভি ফুটেজ, ট্রাক পরিবহনের রুট ও সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেনও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কারণ এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই স্পষ্ট হবে কোস্ট গার্ডের জব্দ করা সার আসলেই পুলিশি হেফাজত থেকে বেরিয়ে বিক্রি হয়েছিল, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো বাস্তবতা।


