ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন মেঘনা নদীতীরবর্তী তিন গ্রামের বাসিন্দা ও কৃষকরা। মেঘনা নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনে বাধা দিতে গিয়ে হুমকির শিকার হওয়ার অভিযোগে তারা বিক্ষোভ করেন।
শনিবার (৮ আগস্ট) বেলা ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা অবরোধ চলায় মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপনের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেন বিক্ষোভকারীরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শনিবার সকালে আশুগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরপুর, তাজপুর ও দুর্গাপুর গ্রামের লোকজন মেঘনা নদীতে গিয়ে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনে বাধা দেন। তাদের অভিযোগ, এ সময় বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা চারটি স্পিডবোটে করে এসে পিস্তল দেখিয়ে গুলি করার হুমকি দেন। এমনকি তাদের গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করে দেয়ারও হুমকি দেয়া হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে তারা নদী থেকে ফিরে আসেন।
পরে তিন গ্রামের বাসিন্দারা একত্রিত হয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং হুমকির প্রতিবাদে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে সড়কের দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। দুর্ভোগে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বাহাদুরপুর গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন কিভাবে বন্ধ করা যায়, সেজন্য আমরা নদীতে গিয়েছিলাম। সেখানে স্পিডবোটে করে এসে পিস্তল দেখিয়ে গুলি করার হুমকি দেয়া হয়। এমনকি গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করে দেয়ার কথাও বলা হয়েছে। জীবন বাঁচাতে আমরা নদী থেকে ফিরে আসি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী মহল কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার মেন্দিপুর এলাকায় সরকারি ইজারা নেয়া বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের কথা থাকলেও নির্ধারিত এলাকার বাইরে আশুগঞ্জের মেঘনা নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে বালু তুলছে। প্রতিদিন প্রায় অর্ধশত ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে কৃষিজমি, বসতভিটা, মিল-কারখানা, তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ও জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
স্থানীয়রা বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত স্থান ও পরিমাণের বাইরে বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই। এক এলাকার ইজারা নিয়ে অন্য এলাকা থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। একইসাথে নদী ও তীরবর্তী জনপদ রক্ষায় অবৈধ ড্রেজার স্থায়ীভাবে বন্ধ এবং বালু উত্তোলনের সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) একই দাবিতে মানববন্ধন করেন এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, এরপর প্রভাবশালী মহলের লোকজন তাদের ওপর হামলা ও বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছেন।
মহাসড়ক অবরোধ চলাকালে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলেন। পরে তিনি মানববন্ধনে বক্তব্য দেন।
নাদিয়া পাঠান পাপন বলেন, এলাকাবাসী যে দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন, তা যৌক্তিক। আশুগঞ্জে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও শিল্প-কারখানা রয়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে পুরো এলাকা ও এসব স্থাপনা হুমকির মুখে পড়বে।
তিনি আরো বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ দেয়া হবে না। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি এলাকায় থাকা ড্রেজার সরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান। সরকারি নিয়মের বাইরে কোনোভাবেই বালু উত্তোলন করতে দেয়া হবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
এলাকার স্বার্থে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে নাদিয়া পাঠান পাপন বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অবৈধ বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত থাকলে তাদের তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিতে হবে।
পরে তার আশ্বাসে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে অবরোধ তুলে নেন বিক্ষোভকারীরা। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জামাল হোসেন বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে সম্প্রতি অভিযান চালানো হয়েছে। তবে অভিযানের সময় সংশ্লিষ্টরা পালিয়ে যাওয়ায় তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এছাড়া একটি ভলগেটকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


