ধানের জেলা বলে খ্যাত দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে এখন ব্যাপক হারে পান চাষ হচ্ছে। কৃষকদের মতে বর্তমানে উপজেলায় প্রায় ছয় একর জমিতে পান চাষ হলেও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এ বিষয়ে কিছুই জানে না। কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি অফিস থেকে কোনো প্রণোদনা দেয়া হয় না বা খোঁজখবরও নেয়া হয় না। কেবল নিজস্ব পদ্ধতি ও অভিজ্ঞতা থেকেই পান উৎপাদন, বাজারজাত ও পরিচর্যা করেন তারা।
উপজেলার ৭ নম্বর শিবনগর ইউনিয়নের ছোট চণ্ডীপুর, চোকার হাট, শমশের নগর, পাঠকপাড়া, দরগাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ৩০ থেকে ৪০ জন কৃষক প্রায় ছয় একর জমিতে পান চাষ করছেন। ব্যাপক চাহিদা, উপযোগী উর্বর মাটি ও অধিক লাভ হওয়ায় দিন দিন পান চাষের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় বারাইহাটে প্রতি হাটবারে হাজার হাজার টাকার পান বিক্রি হয়। সপ্তাহে দু’দিন বৃহস্পতিবার ও রোববার দিনাজপুর, রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা বারাই হাটে আসেন পান কিনতে।
বহুবর্ষজীবী ও লতানো হওয়ায় পানের বরজে নিয়মিত পরিশ্রম করতে হয় কৃষকদের। একবার পান রোপণ করলে ২০ থেকে ৩০ বছর পান পাওয়া যায়। দুই থেকে তিনদিন পরপর পানের পাতা সংগ্রহ করা হয়। কৃষক দীর্ঘদিন আয় করতে পারেন বলে একে কৃষকের নগদ টাকার ব্যাংকও বলা হয়।
সরেজমিনে উপজেলার শিবনগর ইউপির ছোট চণ্ডীপুর এলাকায় দেখা যায়, ছোট বড় বিভিন্ন আকারের পানের বরজ। পাঠকাঠি, বাঁশের কঞ্চি ও বাতা দিয়ে ঘেরা পানের বরজে কাজ করছেন ৮৫ বছর বয়সী গিরিশ চন্দ্র রায়। বয়সের ভারে ন্যুব্জ গিরিশ চন্দ্র জানান, বংশ পরাম্পরায় তারা পান চাষ করেন। ছোট বেলায় দাদা তারপর বাবার পানচাষ পদ্ধতি দেখে তিনিও শিখেছেন। বর্তমানে ১০ কাঠা জমিতে পানের বরজ রয়েছে তার।
তিনি আরো জানান, দুই থেকে তিন দিন পর পর গাছ থেকে পান সংগ্রহ করতে হয়। দাম কম থাকায় প্রতিহাটে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার পান বিক্রি করেন। আবার দাম বাড়লে ১,০০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি করেন। বারাইহাটে সপ্তাহে দু’দিন হাট বসে। নিয়মিত আয় হয় বলে দিনদিন পান চাষির সংখ্যা বাড়ছে।
একই এলাকার পান চাষি ধরণী কান্ত রায় বলেন, ‘৩০ শতাংশ জমিতে পান চাষ করেছি। গাছ রোপণের দুই থেকে তিন মাস পরই পান বাজারজাত করা যায়। তিনদিন পরপর প্রায় আট হাজার পান পাতা উত্তোলন করি। বর্তমানে দাম কম থাকায় ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকায় বিক্রি করছি। মাঘ-ফাল্গুন-চৈত্র মাসে দাম বেশি থাকায় এই পান তিন থেকে চার হাজার টাকা বিক্রি হয়।’
খরচ সম্পার্কে তিনি বলেন, ‘৩০ শতাংশ জমিতে প্রথমবার পান রোপণে খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। পরে প্রতি বছরে খরচ হয় ৫০ হাজার টাকা। বছরে আয় হয় দুই থেকে তিন লাখ টাকা।’
পরিচর্যা সম্পর্কে বলেন, ‘জমিতে নিয়মিত জৈবসার, খৈল, পচন রোধক স্প্রে করতে হয়। এছাড়া বছরে তিন থেকে চারবার গাছের গোড়ায় মাটি দিয়ে শিকড় ঢেকে দিতে হয়।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে অন্য ফসলের প্রণোদনা দেয়া হলেও পান চাষিদের কোনো প্রণোদনা দেয়া হয় না। এমনকি কৃষি অফিসের সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগই হয় না। উপজেলা কৃষি অফিস এখান থেকে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় কোনো পরামর্শের জন্য তাদের কাছে যাওয়া হয় না বা তারাও আসে না। তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপই নাই পান চাষিদের প্রতি।’
সরেজমিনে বারাই হাটে দেখা যায়, উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের চাষিরা পান বিক্রি করতে এসেছেন। দিনাজপুর, রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা গাড়ি নিয়ে এসেছেন পান কিনতে। কথা হয় ছোট চণ্ডীপুর গ্রাম থেকে পান বেচতে আসা মিঠুন চন্দ্র রায়ের সাথে। তিনি জানান, নয় হাজার পান ১,৮০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। প্রতি হাটেই পান বিক্রি করেন তিনি।
দরগাপাড়া গ্রামের প্রবাস চন্দ্র রায়ের ছেলে সন্তোষ চন্দ্র রায় বলেন, ‘৪৫ শতক জমিতে পানের বরজ করেছি। প্রতি হাটে অর্ধেক জমির পান তুলি। আজ ১৫ হাজার পান ছয় হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। শীতের সময় একই পরিমাণ পান বিক্রি করে ১৫ হাজার টাকারও বেশি পাওয়া যেত।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রায় ১০ বছর আগে পার্শ্ববর্তী উপজেলার একজন ইউনিয়ন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা তাদের ইউনিয়নে পান চাষিদের নিয়ে কর্মশালা করেছিল। তখন আমরা কয়েকজন সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের ফুলবাড়ী উপজেলা থেকে কেউ কোনো দিন আসেও না, খোঁজও নেয় না।’
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফ আব্দুল্লাহ মুস্তাফিন বলেন, ‘ফুলবাড়ী উপজেলায় পান চাষ হয়, তা আমার জানা নেই। কোনো উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাও এ বিষয়ে আমাকে বলেনি। সরেজমিনে গিয়ে এ বিষয়ে খোঁজ খবর নেব।’


