সংসারে অভাব ছিল, ছিল ঋণের বোঝা। সেই অভাবের সংসারে বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে ছিলেন সাব্বির আহমেদ শুভ (৩০)। এক বোন। সংসারের কষ্ট লাঘব করতে বাবা-মায়ের পাশাপাশি বোনকেও গার্মেন্টসে কাজ করতে হতো। দিনের পর দিন পরিশ্রম করেও যখন অভাব কাটছিল না, তখন পরিবারের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখেছিলেন সাব্বির। সেই স্বপ্ন নিয়েই নিজেও ঋণ করে চার বছর আগে পাড়ি জমান সৌদি আরবে।
স্বপ্ন ছিল বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে আয় করবেন, নিজের ও পরিবারের ঋণ শোধ করবেন। বাবা-মাকে গার্মেন্টসের কষ্টকর কাজ থেকে মুক্তি দেবেন। একমাত্র বোনের ভবিষ্যৎও একটু উজ্জ্বল করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারালেন সাব্বির। ঋণ শোধের আগেই এখন তাকে ফিরতে হচ্ছে লাশ হয়ে।
গত রোববার (৯ আগস্ট) বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের মুসা শিল্প এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন সাব্বির। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের শ্রীপুরপাড়া গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে গ্রামের পরিবেশ।
সাব্বিরের মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার ছেলে সংসারের জন্যই চার বছর আগে বিদেশে গিয়েছিল। নিজেও ঋণ করে গিয়েছিল। বলেছিল, কষ্ট করে সব ঋণ শোধ করবে। আমাদের আর কষ্ট করতে হবে না। কত স্বপ্ন ছিল ছেলেটার। এখন আমার ছেলে নেই। এই ঋণ কে শোধ করবে?’
অভাবের সংসারে সাব্বির ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। তার একটি বোন রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্নে নিজের জীবনটাকেই যেন বাজি রেখেছিলেন তিনি। বিদেশ যাওয়ার খরচও জোগাড় করেছিলেন ধারদেনা করে। প্রবাসে থেকেও পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। নিজের কষ্টের কথা না বলে স্বজনদের আশ্বস্ত করতেন ‘সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
দুই বছর আগে নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার খাসখামার গ্রামের আব্দুল জলিলের মেয়ে জলি খাতুনকে (২২) মোবাইলফোনে বিয়ে করেন সাব্বির। নতুন সংসার, ঋণমুক্তি আর পরিবারের স্বচ্ছলতা এসব নিয়েই ছিল তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। প্রিয়জনদের নিয়ে সুন্দর জীবনের সেই স্বপ্ন অবশ্য আর পূরণ হলো না।
সাব্বিরের বাবা বলেন, ‘আমরা গার্মেন্টসে কাজ করে সংসার চালিয়েছি। ছেলে আমাদের কষ্ট দেখে বিদেশে গিয়েছিল। তার নিজের ঋণ ছিল, আমাদেরও ঋণ ছিল। ভেবেছিলাম ছেলে আয় করলে সব শোধ হয়ে যাবে। ছেলে ছিল আমার একমাত্র ছেলে। এখন সে-ই নেই। ঋণ আছে, সংসার আছে, কিন্তু সংসারের ভরসাটাই চলে গেল।’
ভাইকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন সাব্বিরের একমাত্র বোনও। তিনিও গার্মেন্টসে কাজ করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ভাই আমাদের কষ্ট কমানোর জন্য বিদেশে গিয়েছিল। বলত, একদিন আমাদের আর গার্মেন্টসে কাজ করতে হবে না। সংসারে অভাব থাকবে না। ভাইটাই যখন নেই, তখন আমাদের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিদেশ যাওয়ার পরও সাব্বির পরিবারের ঋণের কথা ভুলে যাননি। নিজের কষ্টের উপার্জন থেকে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করতেন। তার স্বপ্ন ছিল একদিন পরিবারের সব দেনা-পাওনা মিটিয়ে বাবা-মাকে একটু স্বস্তি দেবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্নই এখন পরিবারের কাছে কেবল স্মৃতি।
স্থানীয় খাজুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: সোহরাব হোসেন জানান, সাব্বির দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন। মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে তিনি বিদেশে গিয়েছিলেন। এখনো ব্যাংক, এনজিওসহ বিভিন্ন জায়গায় পরিবারের ঋণ রয়েছে। তিনি সরকারের কাছে পরিবারের ঋণ মওকুফ বা পরিশোধে সহযোগিতার দাবি জানান।
নাটোর নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: আল-ইমরান খাঁন বলেন, নিহতদের পরিবারের সাথে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। পরিবারগুলোকে নগদ ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। লাশ পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারি উদ্যোগ চলছে।


