কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় চুরির অপবাদ দিয়ে গাছে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন

মনিরের কুপ্রস্তাবে রাজি না হয়ে তার প্রতিবাদ করায় আমাকেসহ আমার ভাই ও বোনকে জোরপূর্বক দোকানের পাশের বাড়িতে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। আমাদের চিৎকারে এলাকাবাসী এগিয়ে এলে মনির আমাদের চুরির অপবাদ দিয়ে গাছের সাথে বেঁধে মারধর করে এবং চুল কেটে দেয়।

শরীয়তপুর প্রতিনিধি

Location :

Shariatpur
তরুণীকে জুতার মালা পড়ানো হচ্ছে, (ডানে) তরুনীর চুল কেটে দিচ্ছেন অভিযুক্ত মনির মোল্যা
তরুণীকে জুতার মালা পড়ানো হচ্ছে, (ডানে) তরুনীর চুল কেটে দিচ্ছেন অভিযুক্ত মনির মোল্যা |নয়া দিগন্ত

কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এক তরুণীকে চুরির অপবাদ দিয়ে কয়েক ঘণ্টা একটি ঘরে আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় মারধর করা এবং গাছে বেঁধে নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে। তরুণীর মাথার চুল কেটে অপদস্ত করা ছাড়াও তার ছোট দুই ভাই-বোনকেও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাজি শরীয়তউল্লাহ কলেজ সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতেই ভুক্তভোগীদের মা ফাতেমা বেগম (৪১) সখিপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এদিকে অভিযুক্ত মনির মোল্যা গাছে বেঁধে রাখার কথা শিকার করলেও মারধর ও কুপ্রস্তাবের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

সখিপুর থানা ও নির্যাতনের শিকার ওই পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সখিপপুরের ছৈয়াল কান্দি এলাকার মুদি দোকানদার আবুল মোল্লার ছেলে মনির মোল্যা (২৫) দীর্ঘদিন ধরে ফারিয়া আক্তারকে (১৮) উত্যক্ত করে আসছিলেন এবং মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন ধরনের কুপ্রস্তাব দিতেন।

ঘটনার দিন (মঙ্গলবার) সকাল ৮টার দিকে ভুক্তভোগী তরুণী তার বোন মারিয়া আক্তার (১৩) ও ভাই ফাহিমকে (৭) নিয়ে মনির মোল্লার মুদি দোকানে কেনাকাটা করতে যায়। এ সময় অভিযুক্ত মনির তাদের দোকানের সামনেই ওই তরুণীকে নানাভাবে অশালীন কথাবার্তা বলতে থাকে। এর প্রতিবাদ জানালে মনির ওই তরুণীসহ তার ভাই-বোনদেরকে দোকানের পাশের ফৌজিয়া সরদারের বাড়িতে নিয়ে একটি ঘরে আটকে রেখে হাত-পা বেঁধে শারীরিক নির্যাতন করেন।

একপর্যায়ে তাদের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে চুরির অপবাদ দিয়ে মনিরসহ কয়েকজন তরুণীকে গাছের সাথে বেঁধে প্রথমে মারধর করে, পরে মাথার চুল কেটে জুতার মালা পড়িয়ে মধ্যযুগীয় বর্বর কায়দায় নির্যাতন করে।

বিষয়টি জানাজানি হলে দুপুর ১২টার দিকে সখিপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ভুক্তভোগী তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতেই ভুক্তভোগীদের মা ফাতেমা বেগম সখিপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

বৃহস্পতিবার (৫ আগস্ট) বিকেলে এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। থানায় অভিযোগ দেয়ার পর থেকে ভুক্তভোগী পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ভয়ে তারা নিজেদের বাড়ি ছেড়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। আসামি পক্ষের লোকজন অভিযোগ তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের।

ভুক্তভোগী তরুণীর মা ফাতেমা বেগম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মনির আমার মেয়েকে বিভিন্ন ধরনের কুপ্রস্তাব দিচ্ছে। এর আগে আমি তাকে নিষেধ করাতে কিছুদিন চুপ ছিল। মঙ্গলবার সকালে আমার দুই মেয়ে ও এক ছেলে বাজার করতে মনিরের দোকানে যায়। এ সময় মনির আমার বড় মেয়েকে আবার কুপ্রস্তাব দেয়। আমার মেয়ে প্রতিবাদ করলে তাকেসহ আমার তিন সন্তানকে জোরপূর্বক দোকানের পাশের ফৌজিয়ার বাড়িতে নিয়ে একটি রুমে আটকে শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেয়। এছাড়া ছোট মেয়ে ও ছেলেকে রশি দিয়ে পাশের রুমে বেঁধে রাখে।

এরপর চিৎকার দিলে লোকজন এলে তাদের চোর অপবাদ দিয়ে গাছের সাথে বেঁধে মনির, আফসানা, ফৌজিয়া সরদার ও নিশি সরদার মারধর করে মাথার চুল কেটে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। পরে পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে। আমি এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। আমার সন্তানদের মতো যেনো আর কউকে এমন নির্যাতনের শিকার না হতে হয়।

এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী তরুণী বলেন, মনিরের কুপ্রস্তাবে রাজি না হয়ে তার প্রতিবাদ করায় আমাকেসহ আমার ভাই ও বোনকে জোরপূর্বক দোকানের পাশের বাড়িতে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। আমাদের চিৎকারে এলাকাবাসী এগিয়ে এলে মনির আমাদের চুরির অপবাদ দিয়ে গাছের সাথে বেঁধে মারধর করে এবং চুল কেটে দেয়। আমি প্রশাসনের কাছে এই ঘটনার ন্যায় বিচার চাই।

ঘটনার সময় উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, আমরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে এসে দেখি মেয়েটার জামাকাপড় ছেঁড়া এবং শরীরে ওড়না নেই। পরে দেখলাম তাকে গাছের সাথে বেঁধে মাথার চুল কেটে দিচ্ছে ও বাকি দুই ভাই-বোনকে রশি দিয়ে পাশের ঘরে বেঁধে রেখেছে। বিষয়টি জানতে চাইলে মনির বলে তারা নাকি চুরি করছে। কী চুরি করছে সে বিষয়ে কিছু বলে নাই।

কুপ্রস্তাবের বিষয়টি অস্বীকার করে অভিযুক্ত মনির মোল্লা বলেন, মারধরের বিষয়টি মিথ্যা। তারা আমার দোকানে চুরি করেছে। গাছের সাথে বেঁধে রাখার সময় আমি ছিলাম। এর বেশি কিছু আমি করিনি। ফৌজিয়া সরদারসহ বাড়ির লোকজন তার মাথার চুল কেটেছে। আমি এর সাথে জড়িত নই।

ভিডিওতে মারধর করতে দেখা যাওয়া অপর অভিযুক্ত আফসানা, ফৌজিয়া সরদার ও নিশি সরদার সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে রাজি হয়নি।

এ বিষয়ে সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোফাজ্জল হুসাইন বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে ওই তরুণীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। ভুক্তভোগী তরুণীর মা মনির নামে একজনকে অভিযুক্ত করে একটি অভিযোগ দাখিল করেছে। ভুক্তভোগীর পরিবারকে অভিযোগ তুলে নিতে কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা হুমকি দিচ্ছে কি-না এ অভিযোগের বিষয়ে আমার জানা নেই। গাছের সাথে বেঁধে নির্যাতনের বিষয়টি আমি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখেছি। তদন্ত শেষে আমরা পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।