নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দেখতে ২০১৭ সালে কক্সবাজার যাওয়া-আসার পথে তৎকালীন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে ফেনীতে দফায় দফায় হামলা চালায় আওয়ামীলীগ দলীয় সন্ত্রাসীরা। ২৮ ও ৩০ অক্টোবর সংগঠিত ঘটনায় পুলিশ হামলাকারী আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসীদের আড়াল করে উল্টো বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মামলা করে। মামলা দুইটিতে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার এমনকি তাদেরকে রিমান্ডে নিয়েও নির্যাতন করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা দুইটি প্রত্যাহার করা হয়। এরপর একে একে থানা ও আদালতে দায়ের করা হয় পৃথক তিনটি মামলা। এই মামলাগুলোতেও উল্ল্যেখযোগ্য সংখ্যক বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়। এতে করে প্রায় নয় বছর আগে সংগঠিত এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিচার নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফতেহপুর ও মুহুরীগঞ্জসহ ফেনী অংশের বিভিন্ন স্থানে গাড়ীবহরে সশস্ত্র হামলা চালায় আওয়ামীলীগ দলীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের গাড়ির পাশাপাশি ভাঙচুর করা হয় সাংবাদিকদের পাঁচ থেকে সাতটি গাড়িও। এ ঘটনায় একে নাজিবুল ইসলাম নামের এক পুলিশ পরিদর্শক অজ্ঞাতনামা ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামি করে ফেনী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।
৩০ অক্টোবর পরিদর্শন শেষে ফেরার পথে বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে ফের হামলা হয় ফেনী এলাকায়। এ সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপাল ফিলিং স্টেশনের বিপরীতে ‘আবারো খাবো’ হোটেলের সামনে দুইটি বাসে আগুন দেয় দূর্বৃত্তরা। এ ঘটনায়ও ফেনী মডেল থানার এসআই নুরুল হক নামে এক পুলিশ কর্মকর্তা ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৩৫ থেকে ৪০ জনের নামে আরেকটি মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক এমএ খালেক, বিএনপি নেতা দেলোয়ার হোসেন দোলন, জেলা যুবদলের সদস্য সচিব তখনকার ছাত্রদল নেতা নইম উল্লাহ চৌধুরী বরাত, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সালাউদ্দিন মামুন, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন রিয়াদ পাটোয়ারীসহ বিএনপি নেতাকর্মীরা আসামি হন। মামলা দুইটিতে পুলিশ বিএনপির ভিপি জয়নাল ও রেহানা আক্তার রানু গ্রুপের দ্বন্ধের জের ধরে বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
তবে ঘটনার পর এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপি পক্ষ থেকে হামলার জন্য ধর্মপুরের তৎকালীন চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সাকা ও শর্শদি ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান জানে আলমকে দোষারোপ করা হয় এবং বিএনপিতে ভিপি জয়নাল বা রেহানা আক্তার রানুর কোনো গ্রুপিং নেই বলে দাবি করা হয়। তখনকার এই দুইটি মামলায় জেলা বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবকদল, কৃষকদল ও ছাত্রদলের দায়িত্বে থাকা অন্তত অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। অনেক নেতাকর্মীকে রিমান্ডে নিয়ে স্বীকারোক্তিও নেয়া হয়।
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর পটপরিবর্তন হলে সে গাড়ি বহরের হামলায় জেলায় পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ছাগলনাইয়া উপজেলার ঘোপালে গাড়ি বহরে হামলা নিয়ে উপজেলা বিএনপির সাবেক অর্থ-সম্পাদক সুলতান মুহাম্মদ সিকান্দার ভুট্টো ছাগলনাইয়া থানায় একটি, শ্রমিকদল নেতা পরিচয়ধারী মহিপাল যমুনা হাই ডিলাক্স পরিবহনের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মিলন প্রকাশ হাডু মিলন নিজের বাস পোড়ানোর ঘটনায় ২৮ জনের নামে উল্লেখসহ ১৫০ জনকে আসামি করে ফেনী মডেল থানায় এবং বিএনপি নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর মনির আহমেদ বাচ্চু ৭২ জনের নাম উল্লেখ করে ১১০ জনকে আসামি করে আদালতে আরেকটি মামলা দায়ের করেন।
তিনটি মামলার মধ্যে ছাগলনাইয়ার সাবেক বিএনপি নেতা ভুট্টো ও মহিপালের মিলনের করা মামলা নিয়ে রয়েছে ব্যাপক অভিযোগ। এর মধ্যে ছাগলনাইয়ার মামলাটিতে বিএনপির নেতাকর্মীরা যেমন আসামি হয়েছে, তেমনি আসামি হয়েছে জামায়াতের নেতাকর্মীরাও। এ মামলা থেকে যেমন প্রবাসী ও গাড়িচালক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ রেহাই পায়নি, তেমনি রেহায় পায়নি তখনকার অষ্টম-নবম শ্রেণিতে পড়া শিশুরাও। মামলাটি নিয়ে ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। দাবি করা চাঁদা না দেয়ায় যেমন আসামি করা হয়েছে, তেমনি দলের আধিপত্য ও পারিবারিক বিরোধের প্রতিহিংসায় আসামিও হয়েছেন অনেকে। বালু মহালের নিয়ন্ত্রণ নিতেও করা হয়েছে আসামি। এ মামলায় বেশির ভাগে ঘোপাল ও শুভপুরের বাসিন্দা। এ মামলা দায়ের করার পিছনে ঘুরেফিরে উঠে এসেছে ঘোপালের বিএনপি নেতা আলমগীর সিদ্দিকীর নাম। পাশাপাশি এ মামলা দায়েরের পিছনে উঠে এসেছে ঘোপাল ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক মোস্তফা মজুমদার, সদস্য সচিব হুমায়ুন কবির চৌধুরী, যুগ্ম-আহবায়ক সাইফুল ইসলাম বাদশা প্রকাশ লম্বা বাদশা, কামরুল মেম্বার, ইকবাল হোসেন, মোশাররফ হোসেন ও শুভপুরের মাঈন উদ্দিন মামুনের নাম।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর ছাগলনাইয়া থানায় ভুট্টো এই আসনের সাবেক এমপি পলাতক আওয়ামীলীগ নেতা আলাউদ্দিন নাসিমকে প্রধান আসামি করে মোট ২৫১ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন। মামলার নথি বিশ্লেষণ করে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ জনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে এ প্রতিবেদক।
এর মধ্যে বিএনপির ছয়জন, জামায়াতের চারজন, এক পিকআপচালক ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের তিনজনসহ সকলেই তারা ব্যক্তি আক্রোশের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন।
এক সময় ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ছিলেন আব্দুর রহমান আকন। তার ছেলেও ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয়। তবুও আকন এই মামলায় ১০৫ নম্বর আসামি। শুধু তাই নয়, ওই মামলায় তার বৃদ্ধ বাবা সিরাজ আলম (৭০) ১৬৭ নম্বর আসামি।
সিরাজ আলম বলেন, ‘কখনো কোনো দলের সাথে ছিলাম না। আমার ছেলে যারা মামলা করেছে বিএনপির নিজেদের রাজনীতিতে তাদের প্রতিপক্ষ, এজন্য আমাকেও আসামি করা হয়েছে। ঘোপালের বিএনপি নেতা আলমগীর সিদ্দিকী এটা করেছে।’
ছাগলনাইয়া উপজেলা আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক রিয়াজ পাটোয়ারী। এই মামলার ২৩৭ নম্বর আসামি। ঘটনার সময় তিনি সৌদি আরব। ফেনী ক্লাব ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিমের (৭৩) শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে রণাঙ্গনের সৈনিক ছিলেন দাবি করে বলেন, ঘটনার দিন তিনি ওমরা পালনে ছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, এ মামলায় কারো থেকে ৫০ হাজার, কারো থেকে এক লাখ টাকা বা আরো বেশিও চাঁদা দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে বেশি চাওয়া হয়েছে। এমন ভুক্তভোগী বেশ কয়েকজনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তারা ভয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি।
এছাড়া ঘটনার সময় মামলার বাদি সুলতান মুহাম্মদ সিকান্দার ভুট্টো নিজেই প্রবাসে ছিলেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
ছাগলনাইয়া থানা সূত্র জানায়, এই মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে ৮২ জন। এর মধ্যে এখনো তিনজন কারাগারে। এছাড়া আরো ১১ জন আদালতে হাজির হয়ে জামিনে রয়েছেন।
এদিকে ৩০ অক্টোবর মহিপালে গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় শ্রমিক দল পরিচয় দেয়া আবুল কাশেম মিলন প্রকাশ হাডু মিলনের করা মামলায়ও বিএনপির অন্তত আটজন নেতাকর্মীকে আসামি হয়েছে বলে দলের বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
মিলন নিজেকে শ্রমিক দল নেতা দাবি করলেও গণঅভুত্থানের আগে তিনি শ্রমিকলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন বলেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যারে নেতাকর্মীরা জানায়। তবে মিলনের দাবি তিনি শ্রমিকলীগে ছিলেন না। হামলার দিন তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের আপ্যায়নের দায়িত্বে ছিলেন। পুলিশের দায়ের করা মামলায় তিনি আসামি ছিলেন বলেও দাবি করেন।
তবে মিলনের মামলার বিষয়টি বেশি সমালোচিত হয় সম্প্রতি যুবদলে কমিটি গঠন নিয়ে। গাজী এনামুল হক প্রকাশ সুজন নামে ওই মামলার একজন আসামি ফেনী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়ায় ওই কমিটিসহ পুরো যুবদলের করা ওয়ার্ড কমিটি সমূহ বাতিল করা হয়। একইসাথে বহিষ্কার করা হয় পৌর যুবদলের সভাপতি জাহিদ হোসেন বাবলু ও সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী রাসেল পাটোয়ারীকে। স্থগিত করা হয় জেলা যুবদলের কমিটি।
ছাগলনাইয়া থানায় করা মামলার বাদী সুলতান মুহাম্মদ সিকান্দার ভুট্টো বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘এটায় পুরা জেলা থেকে আসামি করা হয়েছে। এখানে পরশুরাম-ফুলগাজীরও আছে। আমাদের ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারা যাচাই-বাছাই করে দিয়েছে। আমি সবাইকে চিনি না। হ্যাঁ, আমাদের দলের অনেকেও আসামি হয়েছে। হয়তো তখন অনেকে প্রতিহিংসা বসত দিয়ে দিছে। তবে আওয়ামীলীগের যারা মামলায় আছে সবাই হামলায় ছিল।’
জেলা বিএনপির আহবায়ক শেখ ফরিদ বাহার উল্লেখিত মামলা সমূহ সম্পর্কে বলেন, দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই ব্যক্তিগতভাবে যারা এসব মামলা করেছেন এর দায়-দায়িত্ব বিএনপির নয়। তবে ঘটনায় জড়িত প্রকৃত সন্ত্রাসীদের আসামি করে আরেকটি মামলা দায়েরের চিন্তা করছে বিএনপির শীর্ষ নেতারা।
অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলায় দায়ের করা মামলার তদন্ত প্রসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি ও ক্রাইম) মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বারবার তদন্তকারী কর্মকর্তা বদল হওয়ায় এখনো চার্জশিট তৈরী হয়নি। তবে উল্লেখিত মামলা সমূহে পুলিশি তদন্তে ঘটনায় জড়িত প্রকৃত আসামিদের শনাক্ত করা সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, নিরপরাধ লোকজন যাতে হয়রানির শিকার না হয় এ ব্যাপারে পুলিশ আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবে।


