ঢাকা–ময়মনসিংহ–জামালপুর দেশের অন্যতম ব্যস্ত রেলপথে দুর্ঘটনা, ইঞ্জিন বিকল ও লাইনচ্যুতি যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মাত্র আড়াই মাসে পাঁচটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে। অন্যদিকে গত তিন মাসে ইঞ্জিন বিকল, আগুন, সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও লাইনচ্যুতিসহ অন্তত ১৯টি বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটেছে। এতে লাখো যাত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সর্বশেষ শুক্রবার (৭ আগস্ট) গফরগাঁও স্টেশনের অদূরে জামালপুর কমিউটার ট্রেনের পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে ৭ ঘণ্টা ঢাকা–ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। এর আগে ১৬ জুলাই ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে একই রুটে পৃথক লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটে। ১০ জুন ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ রেলক্রসিং এলাকায় ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেসের পাওয়ার কার লাইনচ্যুত হলে উদ্ধারকারী ট্রেনও লাইনচ্যুত হয়।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুনে তিনটি, মে মাসে আটটি এবং এপ্রিলে ছয়টি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়। গত ১৫ জুন গফরগাঁওয়ে জামালপুর এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ও বগির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই দিন আঠারোবাড়িতে বিজয় এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনে আগুন লাগে এবং পরে বিকল্প ইঞ্জিনও বিকল হয়। ১৩ জুন ময়মনসিংহ স্টেশনে তিস্তা এক্সপ্রেসের এসি কোচে আগুন লাগে।
বারবার দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কার্যকর পরিবর্তন না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা–ময়মনসিংহ রেলপথের বিভিন্ন স্থানে রেললাইনকে স্লিপারের সাথে সংযুক্ত রাখা ফাস্টেনিং ক্লিপ ভাঙা বা অনুপস্থিত। কোথাও ক্ষয়প্রাপ্ত স্লিপার, দুর্বল বেস প্লেট ও সংযোগস্থল চোখে পড়ে।
রেলপথ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ত্রুটি দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলে ট্র্যাকের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে লাইনচ্যুতির ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি পুরোনো ট্র্যাক, দুর্বল ব্যালাস্ট, বসে যাওয়া লাইন এবং সেতুর দুই পাশের মাটি ধসে পড়ার ঘটনাও উদ্বেগজনক।
রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, ‘এই রুটের অধিকাংশ ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ। নতুন ইঞ্জিন সংযোজনের পাশাপাশি শ্রীপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে বিদ্যাগঞ্জ, গৌরীপুর, আঠারোবাড়ি, মোহনগঞ্জ ও জারিয়া পর্যন্ত রেলপথ দ্রুত সংস্কার জরুরি। পাথরের ঘাটতির কারণে ট্র্যাক দুর্বল হয়ে পড়ছে।’
ময়মনসিংহ লোকোশেডের পরিদর্শক শফিউল হাসান জানান, অনেক পুরোনো ইঞ্জিন পূর্ণাঙ্গ মেরামতের আগেই চলাচলে নামাতে হচ্ছে, ফলে বিকলের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
এই রুটে বর্তমানে ১৮ জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও ইঞ্জিন ও কোচ সঙ্কটে কয়েকটি মেইল ও লোকাল ট্রেন বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি অসংখ্য অবৈধ ও অরক্ষিত রেলক্রসিং, গেটম্যান সঙ্কট এবং দুর্বল সিগন্যালিং ব্যবস্থাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
যাত্রীদের দাবি, আশ্বাস নয়—ঝুঁকিপূর্ণ ট্র্যাক সংস্কার, ভাঙা ফাস্টেনিং ক্লিপ ও স্লিপার প্রতিস্থাপন, নতুন ইঞ্জিন সংযোজন, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথকে নিরাপদ করা হোক। অন্যথায় আরো বড় দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হবে।


