সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন

জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় বেড়েছে লোডশেডিং

সিলেটে টানা দু’সপ্তাহ ধরে চলছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিনই অন্তত ৫০-৬০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে সিলেট।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
সিলেটে জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় বেড়েছে লোডশেডিং
সিলেটে জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় বেড়েছে লোডশেডিং |নয়া দিগন্ত

সিলেটে টানা দু’সপ্তাহ ধরে চলছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিনই অন্তত ৫০-৬০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে সিলেট। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদামতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (পিডিবি) সিলেট আঞ্চলিক কার্যালয়কে।

এদিকে, সিলেট বিভাগের কুমারগাঁও, বিবিয়ানা, শাহজিবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট থেকে গড়ে প্রতিদিন ২২০০ থেকে ২৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও এর কোনো সুফল পায় না সিলেটের প্রায় কোটি গ্রাহক। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ দানা বাঁধছে।

পিডিবি বলছে, জাতীয় গ্রিড থেকে যতটুকু বিদ্যুৎ পায়, ততটুকুই তারা বিতরণ করে। বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকলে সেখানে পিডিবির কিছুই করার নেই। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের দায়িত্ব পিডিবির নয়।

তথ্য বলছে, সিলেটে গত কয়েক দিন ধরে প্রচণ্ড গরম পড়েছে। বর্ষার আকাশে মেঘ আছে, তবুও গরমে টেকা দায়। তাপমাত্রা বেশি থাকায় তীব্র গরমে হাঁসফাঁস করছেন নগরবাসী। এর মধ্যে বিদ্যুতের তীব্র লোডশেডিং ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন অবস্থায় নগরজীবনে স্থবিরতা বিরাজ করছে।

সিলেট আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ২৯ জুলাই সিলেটে তাপমাত্রা ছিল ৩৫.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে ২৮ জুলাই ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২৭ জুলাই ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও ২৬ জুলাই ৩৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। তারপর থেকে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির নিচে নামলেও তীব্র গরম অনুভব করছেন নাগরিকরা। বাতাসে প্রচুর জলীয় বাষ্প থাকায় আঁচটা খুব বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় জানিয়েছে, সোমবার (৩ আগস্ট) সকাল ১০টায় সিলেটে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬৮ মেগাওয়াট। সেখানে সরবরাহ করা হয়েছে ১৩৮ মেগাওয়াট। তবে প্রতি ঘণ্টায় সেই চাহিদা ওঠানামা করে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে গরম বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। তখন লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ে। সোমবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে সিলেট।

প্রায় প্রতিদিনই বিদ্যুৎ ঘাটতি ৬০-৭০ মেগাওয়াটে ওঠানামা করে বলে জানান কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরেই সিলেটে বেড়েছে লোডশেডিং। চাহিদার ৫০-১০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে সিলেটে। বিদ্যুৎ কম পাওয়ায় বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে পিডিবিকে। তীব্র এই গরমের মাঝে লোডশেডিং হওয়ায় জনভোগান্তি বেড়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুরা চরম কষ্টে পড়েছেন।

নগরবাসী বলছেন, প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ বার লোডশেডিং করে বিদ্যুৎ অফিস। দিনে গড়ে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকে সিলেট। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে জনসাধারণকে।

জানা গেছে, মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গত ১০-১২ দিনে জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। মোট গ্যাস সরবরাহ কমেছে দৈনিক প্রায় ৪৯ কোটি ঘনফুট। এই ঘাটতির ধাক্কা পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমেছে প্রায় ২৩ কোটি ঘনফুট, আর গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ২৫ শতাংশ। গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে কয়লা ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো হলেও চাহিদার পুরোটা মেটানো যাচ্ছে না। তাতে ২৫ জুলাই রাত ১১টায় লোডশেডিং সর্বোচ্চ ৯৬২ মেগাওয়াটে ওঠে।

দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে সাধারণ সময়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন দৈনিক প্রায় ১৬০ কোটি থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ১০০ কোটি থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট আসে।

পেট্রোবাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ জুলাই সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় এলএনজির সরবরাহ ছিল ৯৯ কোটি ৩৫ লাখ ঘনফুট। ২৫ জুলাই সকাল ৮টা থেকে ২৬ জুলাই সকাল ৮টা পর্যন্ত তা কমে ৫০ কোটি ১১ লাখ ঘনফুটে নেমে আসে। অর্থাৎ ৫ দিনের ব্যবধানে জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা গ্যাসের দৈনিক সরবরাহ কমেছে ৪৯ কোটি ২৪ লাখ ঘনফুট, যা প্রায় ৫০ শতাংশ। এই সময়ে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনে বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেছে। কিন্তু এলএনজি কমে যাওয়ায় দেশীয় গ্যাস ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে মোট সরবরাহ ২৬৪ কোটি ১ লাখ ঘনফুট থেকে কমে ২১৫ কোটি ১৭ লাখ ঘনফুট হয়েছে।

সরকারি হিসাবে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সে হিসাবে সর্বশেষ সরবরাহের সাথে চাহিদার ব্যবধান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট। সমুদ্রপথে জাহাজে আনা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ভাসমান টার্মিনালে গ্রহণ করে আবার গ্যাসে রূপান্তর করা হয়।

এরপর পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হয়। মহেশখালীতে এ ধরনের দুটি ভাসমান টার্মিনাাল রয়েছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে এর একটির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তৈরি হয়েছে সঙ্কট। প্রথম ধাপে দৈনিক ২৮ থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে পারে, আর পূর্ণ সক্ষমতায় (১০০-১১০ কোটি ঘনফুট) ফিরতে লাগতে পারে আরো এক সপ্তাহ।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন সোমবার নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমরা জাতীয় গ্রিড থেকে যতটুকু বিদ্যুৎ পাই, ততটুকুই বিতরণ করি। বিদ্যুৎ বিতরণ করাই আমাদের দায়িত্ব।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ কম পাওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে।’

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গণমাধ্যমকে জানান, কারিগরি জটিলতায় পড়া টার্মিনাল থেকে চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে।