প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, ‘রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলকে দেশের নতুন বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ধারাবাহিকভাবে নীতিগত সংস্কার, কর-সুবিধা, অর্থায়ন, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। বিনিয়োগের পথে থাকা বড় বাধাগুলো অনেকটাই দূর করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে এগিয়ে আসা।’
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজশাহীতে প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) মিলনায়তনে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে আয়োজিত আঞ্চলিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও সুইসকন্ট্যাক্ট যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
উপদেষ্টা ড. তিতুমীর বলেন, অন্তর্বর্তী সঙ্কট কাটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শুধু পুনরুদ্ধার নয়, পুনর্গঠন করে টেকসই সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়াই সরকারের লক্ষ্য। এ লক্ষ্য সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ এবং সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই দর্শন বাস্তবায়নে কাজ করছেন। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অঞ্চলভিত্তিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোকে মূলধারার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করাই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য সামনে রেখে বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথমত নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা যাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন, সে জন্য এবারের বাজেটে পাঁচ বছরের কর কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি রফতানিমুখী সব পণ্যের জন্য সমতাভিত্তিক কর-সুবিধা দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘একজন বিনিয়োগকারীকে অন্তত পাঁচ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হয়। রাষ্ট্রের নীতি কী হবে, সেই নিশ্চয়তা আমরা দিচ্ছি।’
দ্বিতীয়ত, ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজ করতে ব্যাপক ডিরেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হচ্ছে। লাইসেন্স গ্রহণ থেকে কারখানা চালু হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে ট্র্যাক করা যাবে।
তিনি বলেন, ‘সরকার ব্যবসা করতে চায় না। সরকারের কাজ পথ তৈরি করে দেয়া, পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো নয়।’ অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অতীতে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অর্থায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অনিয়মে ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে উভয় খাতেই বড় ধরনের সংস্কার চলছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে ওঠে।
তিনি জানান, বর্তমানে ৪৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালু রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৯ হাজার কোটি টাকার পৃথক তহবিল এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা রয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক শিল্প বিকাশে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে তিন হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে উল্লেখ করে
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে উত্তরাঞ্চলে কৃষি হাব গড়ে তুলতে এভাবে আলাদা তহবিল আগে রাখা হয়নি।’
তবে এসব সুযোগ-সুবিধার তথ্য অনেক উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছায় না উল্লেখ করে চেম্বার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ড. তিতুমীর বলেন, ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমাতে কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল করা হচ্ছে। এতে এনবিআর কার্যালয়ে বারবার যেতে হবে না এবং লালফিতার দৌরাত্ম্যও কমে আসবে।
তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ এবং সরবরাহব্যবস্থার সংকটের প্রেক্ষাপটে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের বিকল্প নেই। উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, রাজস্ব আয় বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে। শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতেও সরকার শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার এখন জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে রাজশাহীতে সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ভবন ও শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলে দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যেই বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসবে। এ বিষয়ে সরকারি অফিসগুলোতেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের পণ্য দ্রুত চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরে পৌঁছাতে রেলপথ আধুনিকায়নের কাজ চলছে। ব্রডগেজ ও মিটারগেজের সীমাবদ্ধতা দূর করে ডুয়াল গেজ রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু কৃষিপণ্য উৎপাদন নয়, কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হবে। আলু, ভুট্টা, আম ও লিচুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। আলু থেকে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই), দুগ্ধভিত্তিক শিল্প, মোজারেলা চিজ, ফুলভিত্তিক শিল্প এবং নুড়ি-পাথরভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলারও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার নীতিগত ভিত্তি তৈরি করেছে এবং বিনিয়োগের বাধা দূর করেছে। এখন অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড়—সব ধরনের উদ্যোক্তাকে এগিয়ে আসতে হবে। কৃষিপণ্যের প্রাথমিক উৎপাদকদের উদ্যোক্তায় রূপান্তর এবং বড় শিল্পের পাশাপাশি সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে।
তিনি আরো জানান, প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানে উদ্যোগ নিচ্ছেন। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করতে অশুল্ক বাণিজ্য বাধা কমানো, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) মতো উদ্যোগেও সরকার কাজ করছে।
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: মাহফুজুর রহমান রিটন, রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম এবং স্থানীয় উদ্যোক্তারা বক্তব্য দেন।


