কুমিল্লার দেবিদ্বারের আলোচিত ফরিদা ইয়াসমিন হত্যার ঘটনায় লাশের মাথা ও পায়ের খন্ডিত অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে একটি ডোবা থেকে মাথা ও দুই পায়ের খন্ডিত অংশ উদ্ধার করা হয়।
এর আগে রোববার সকালে একটি ড্রামের ভেতর থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় দু’টি পলিথিন ব্যাগে লাশের আরো কিছু খন্ডিত অংশ উদ্ধার করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এ ঘটনায় শনিবার (৮ আগস্ট) রাতে নিহত ফরিদা ইয়াসমিনের স্বামী মো: মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া দেবিদ্বার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় চারজনকে আসামি করা হয়।
মামলার ১ নম্বর আসামি লাইলী আক্তারকে বিক্ষুব্ধ জনতা শনিবার সন্ধ্যায় আটক করে থানা পুলিশের হাতে তুলে দেয়। রোববার দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কুমিল্লা কারাগারে পাঠানো হয়। মামলা ও কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি রোববারে দুপুরে নিশ্চিত করেছেন দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: মনিরুজ্জামান।
গ্রেফতার লাইলী আক্তার দেবিদ্বার পৌর এলাকার চাপানগর গ্রামের মো: আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী। মামলার অন্য আসামিরা হলেন— পৌর এলাকার চাপানগর গ্রামের জহিরুল ইসলামের ছেলে মো: আমির হোসেন, একই গ্রামের মরহুম ফারুক মিয়ার ছেলে মো: সোহেল রানা ও মরহুম লিলু মিয়ার ছেলে মো: রবিউল ইসলাম। তবে তাদের এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
নিহত ফরিদা ইয়াসমিন (৫৫) দেবিদ্বার পৌরসভার ফতেহাবাদ গ্রামের মো: মফিজুল ইসলামের স্ত্রী।
ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, ফরিদা ইয়াসমিনের স্বামী মো: মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া চট্টগ্রামে জাহাজে চাকরি করেন। ফরিদা ইয়াসমিন দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে দেবিদ্বার পৌরসভার ছোট আলমপুর পূর্বাশা আবাসিক এলাকার ‘ভূঁইয়া হাউজে’ নিজ বাসায় স্বামী ও দুই মেয়ে নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। দুই মেয়ের বিয়ে হলেও ছোট মেয়ে মরিয়ম আক্তার থাকতেন মায়ের সাথে এবং বড় মেয়ে স্বামীর বাড়িতেই থাকেন। ১০ বছর আগে একমাত্র ছেলে ইব্রাহীম খলিল সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়।
ছোট মেয়ে এক দিনের জন্য স্বামীর বাড়িতে যাওয়ায় শুক্রবার (৭ আগস্ট) ফরিদা ইয়াসমিন রাতে বাসায় একাই ছিলেন। ঘটনার মাত্র ১২ দিন আগে ফরিদা ইয়াসমিনের একটি ঘর ভাড়া নেয় লাইলী আক্তার। এরপর বাড়ির মালিক ফরিদা ইয়াসমিনের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন তিনি এবং ঘরের কোথায় কোথায় স্বর্ণালঙ্কার, টাকা পয়সা আছে তা কৌশলে সন্ধান করতে থাকেন।
শুক্রবার রাতে সুযোগ বুঝে ভাড়াটিয়া লাইলী আক্তার তার স্বামী আবুল কালাম, রবিউল ও সোহেলকে ডেকে এনে ফরিদা ইয়াসমিনকে হত্যা করেন। পরে লাশ খন্ড খন্ড করে কয়েকটি পলিথিনের ব্যাগে মুড়িয়ে বাড়ির পেছনে ফেলে রাখেন।
এরপর শনিবার সকাল থেকে ফরিদা ইয়াসমিনকে মোবাইলফোনে না পেয়ে ছোট মেয়ে ও স্বজনরা এসে তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। শনিবার বিকেলে ফরিদা ইয়াসমিনের বোনের ছেলে মামুন এসে ভাড়াটিয়া লাইলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় তার কথাবার্তা সন্দেহজনক হলে তাকে আটকে রেখে বাড়ির আশপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
একপর্যায়ে বাড়ির পেছনে পলিথিনে মোড়ানো ফরিদা ইয়াসমিনের খন্ড খন্ড লাশ দেখতে পান মামুন ও স্বজনরা। ঘটনার পর পর স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা লাইলী আক্তারকে বিদ্যুতের খুঁটিতে হাত-পা বেঁধে গণধোলাই দেয়। পরে শনিবার সন্ধ্যায় পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে চিকিৎসার জন্য দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। তবে, সেখানেও বিক্ষুব্ধ জনতা তার ওপর হামলা চালানোর চেষ্টা করে।
পরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ এসে লাইলীকে থানায় নিয়ে যায় এবং রাত সাড়ে ৮টার দিকে পলিথিনে মোড়ানো ফরিদা ইয়াসমিনের খন্ড খন্ড লাশের নয়টি প্যাকেট উদ্ধার করে। এরপর রোববার সকালে লাশের আরো দু’টি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। তবে লাশের মাথা ও দুই পা তখনো পাওয়া যায়নি বলে জানায় পুলিশ। তবে, বিকেলে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে একটি ডোবা থেকে মাথা ও দুই পায়ের খন্ডিত অংশ উদ্ধার করা হয়।
ফরিদা ইয়াসমিনের ছোট মেয়ে মরিয়ম আক্তার বলেন, আমাদের দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, মার সাথে আমিও বাড়িতে থাকতাম। কিন্তু শুক্রবার আমি শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ায় রাতে মা বাসায় একাই ছিলেন। সকালে বাবা ফোন করে বলেন, তোর মায়ের ফোনে রিং হয় কিন্তু রিসিভ করে না তুই বাড়িতে গিয়ে একটু খোঁজ নে। আমি মাকে খুঁজতে বাড়িতে এসে প্রথমে বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে খোঁজ করি। পরে কোথাও না পেয়ে থানায় যাই।
থানা থেকে বাড়ি এসে ভাড়াটে লাইলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ঘরের বারান্দার ফ্লোরে ধোয়া-মোছার দাগ ও স্যাঁতসেঁতে ভেজা অংশ লক্ষ্য করি। এতে আমার সন্দেহ হলে আমি লাইলীকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করি। এতে তার কথাবার্তায় অসঙ্গতি দেখতে পাই। তারা মাকে হত্যার পর বাড়ির কাজ করার জন্য আনা সাত লাখ টাকা ও প্রায় ১৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফুর রহমান ও প্রতিবেশী শিক্ষিকা নিলুফা আক্তার বলেন, দেবিদ্বারে শিশু ফাহিমাকে লাইলীসহ যে পাঁচজন গলা কেটে হত্যা করেছে, ফরিদা ইয়াসমিনকেও একই আসামিরা হত্যা করেছে। লাইলী প্রকাশ্যে জবানবন্দিতে তাদের নাম বলেছে। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে, তবুও বিচারক তাদের বিচার শেষ না হতেই জামিন দেয়। যার কারণে ফরিদা ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো।
দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: মনিরুজ্জামান বলেন, সকালে নিহত ফরিদা ইয়াসমিনের লাশের আরো কিছু অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। বিকেলে মাথা ও পায়ের অংশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী মো: মফিজুল ইসলাম থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার প্রধান আসামি লাইলীকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে দেবিদ্বার-ব্রাহ্মণপাড়া (সার্কেল) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো: শাহীন বলেন, লাইলী আক্তার ২০২১ সালে শিশু ফাহিমা হত্যাকাণ্ডেও জড়িত ছিলেন। সে কয়েক মাস আগে কারাগার থেকে জামিনে ছাড়া পায়। এরপর বিভিন্ন জায়গায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। প্রায় ১২ দিন আগে এই বাসায় ভাড়ায় উঠেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, বাড়ির মালিকের স্বর্ণালঙ্কারের লোভে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর আরো কয়েকজনের নাম পেয়েছি তাদেরকেও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এই ঘটনায় দেবিদ্বার থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। মামলার অন্য আসামিরা পলাতক রয়েছেন, তবে তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০২১ সালে ১৪ নভেম্বর লাইলীর সাথে নিজের বাবাকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় পাঁচ বছরের শিশু ফাহিমাকে গলা কেটে হত্যা করে একটি খালে পুঁতে রাখে তার বাবা আমির হোসেন ও পরকীয়া প্রেমিকা লাইলী আক্তার। ওই ঘটনার সাত দিন পর একটি খাল থেকে ফাহিমার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ।
তবে ফাহিমা হত্যার বিচার শেষ হওয়ার আগেই প্রায় সাড়ে চার বছর কারাভোগ শেষে কয়েক মাস আগে জেল থেকে জামিনে ছাড়া পান লাইলী আক্তারসহ সকল আসামি।


