আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও পদোন্নতি

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও কারণ দর্শানোর নির্দেশ থাকার পরও পদোন্নতি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক আমানুল্লাহ ফেরদৌসের বিরুদ্ধে।

মো: আজিজুল হক, গাজীপুর মহানগর
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ |নয়া দিগন্ত

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও কারণ দর্শানোর নির্দেশ থাকার পরও পদোন্নতি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক আমানুল্লাহ ফেরদৌসের বিরুদ্ধে।

উচ্চ আদালতে করা রিটের শুনানি শেষে পদোন্নতির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি এবং ভিসিকে দুই সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেয়া হলেও তা উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ১১২ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ ঘটনায় ভিসির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ তুলেছেন তারা।

অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ ১৪ বছর আইনি লড়াইয়ের পর সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে চাকরিতে পূর্ণ পুনর্বহাল হওয়া ৯৮৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭০তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যোগ্য প্রত্যেককে দুটি করে পদোন্নতি দেয়ার কথা। কিন্তু কর্তৃপক্ষ প্রথম ধাপে একটি পদোন্নতি দেয়ার পর দ্বিতীয় ধাপে ‘শূন্য পদ নেই’—এমন যুক্তিতে ৯৮৮ জনের মধ্যে মাত্র ২১৯ জনকে পদোন্নতি দেয়। এতে ৭৬৯ কর্মকর্তা-কর্মচারী বঞ্চিত হন।

বঞ্চিতদের অভিযোগ, একদিকে শূন্য পদ না থাকার কথা বলা হলেও অন্যদিকে ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০১৪-২০১৮ সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সহকারী পরিচালক মো: আমির হোসাইন, সহকারী পরিচালক মনিরুজ্জামান ও সেকশন অফিসার মো: হাফিজুর রহমানসহ বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করা হয়। রিটটির নম্বর ৫২২১/২০২৬।

রিটের শুনানি শেষে আদালত পদোন্নতি কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং ভিসিকে দুই সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন বলে রিটকারীদের আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টরা জানান।

অভিযোগ রয়েছে, ওই নির্দেশের পরও ভিসি কর্তৃপক্ষ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ১১২ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতি দেয়। এমনকি আদালতের দেওয়া রুলেরও যথাযথ জবাব দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন রিটকারীরা।

এ অবস্থায় বিষয়টি আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনার পরও পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া বিচার বিভাগের আদেশের প্রতি অবজ্ঞার শামিল।

শুধু পদোন্নতি নয়, মামলা পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিরও অভিযোগ উঠেছে। প্রথম রিটকারী মো: আমির হোসাইনকে প্রথমে চট্টগ্রামে বদলি এবং পরে শোকজ করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বদলির আদেশের বিরুদ্ধে তিনি পৃথক রিট করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত বদলির আদেশ স্থগিত করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এরপর দ্বিতীয় রিটকারী মনিরুজ্জামানকেও বদলির আদেশ দেয়া হয় বলে অভিযোগ।

এ ছাড়া ভিসির মতের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় উপপরিচালক মাসুদুর রহমান, উপপরিচালক আকরাম হোসেন, উপপরিচালক বশির উদ্দিন ও উপপরিচালক মো: দিদারুল আলমকে আঞ্চলিক কেন্দ্রে বদলি করার অভিযোগও রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় ভিসির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তা প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে আলোচিতদের মধ্যে রয়েছেন পরিচালক (শারীরিক শিক্ষা) শফিউল করিম, পরিচালক (অডিট) মো: জসিম উদ্দিন, পরিচালক নজরুল ইসলাম এবং পরিচালক (শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা) মাসুদ রানা আতাউর। তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও অতীত নিয়োগের বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীরা আরো জানান, ‘ফ্যাসিবাদী আমলের পদোন্নতি’ বহাল রাখা এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো নিষ্পত্তি করতে ভিসি একটি রিট (২৩৬৩/২০২৬) দায়ের করেন। চেম্বার জজ আদালত এবং পরে অ্যাপিলেট ডিভিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি শেষে রিটটি খারিজ করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। ফলে আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগটি আরো গুরুতর হয়ে উঠেছে বলে দাবি তাদের।

বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, তারা দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই করে চাকরি ফিরে পেয়েছেন। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরও যদি একই প্রতিষ্ঠানে তাদের সিনিয়রিটি ও পদোন্নতির অধিকার নিয়ে নতুন করে বৈষম্য করা হয়, তাহলে তারা আবারো আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হবেন।

তাদের প্রশ্ন, আদালতের আদেশের পরও যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়, তাহলে আইনের শাসন ও আদালতের কর্তৃত্ব কোথায় থাকবে?

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ।

তিনি বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীই চাকরিতে পূর্ণ পুনর্বহাল এবং পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কোনো পদোন্নতি দেয়া হয়নি।’

তার দাবি, পদোন্নতির পুরো প্রক্রিয়াই বিধি ও আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে।

এদিকে অভিযোগকারীরা বলছেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারির পর পদোন্নতির কোনো কার্যক্রম চালানো হয়ে থাকলে তা আদালত অবমাননার প্রশ্ন সৃষ্টি করে। তাই সংশ্লিষ্ট আদেশ, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত, পদোন্নতির তালিকা এবং আদালতের রুলের জবাব পর্যালোচনা করে বিষয়টির আইনগত নিষ্পত্তি জরুরি।

তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হোক।