বৃদ্ধ মায়ের চোখে এখন আর ঘুম নেই। প্রতিটি দিন কাটে বুকভরা শঙ্কা আর অপেক্ষায়। ছেলের কোনো খবর পেলেই ছুটে যান প্রতিবেশীদের কাছে। কখনো কাঁদেন, কখনো আল্লাহর কাছে হাত তুলে দোয়া করেন। তার একটাই আকুতি—‘আমার আর কিছু লাগবে না, শুধু আমার ছেলেটারে আইনা দেন।’

এই আর্তনাদ ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা ইউনিয়নের উজান ভাটিপাড়া গ্রামের জোসনারা বেগমের। তার ছেলে শাহরিয়ার সুমন (৩৮) বর্তমানে ইউক্রেনের একটি বন্দিশিবিরে আটক রয়েছেন বলে পরিবারের দাবি।
গত শনিবার দুপুরে শাহরিয়ারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো পরিবার অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন পার করছে। কিছুক্ষণ পর মসজিদ থেকে নামাজ শেষে বাড়ি ফেরেন বাবা ওয়াজেদ আলী। ছেলের প্রসঙ্গ উঠতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বিদেশ পাঠানোর জন্য জমিজমা বিক্রি করছি। বড় ছেলেরাও ঋণ কইরা টাকা দিছে। ভাবছিলাম, বিদেশে গিয়ে কামাই কইরা সংসারের অভাব দূর করবো। কিন্তু দালালের খপ্পরে পইড়া যুদ্ধে চলে গেছে। এই অবস্থা জানলে কোনো দিন বিদেশ যাইতে দিতাম না। সরকার আমার পোলাডারে দেশে ফিরাইয়া আনুক।’
ভালো জীবনের স্বপ্ন, তারপর দুঃস্বপ্ন
শাহরিয়ার ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় কাটিং মাস্টার হিসেবে কাজ করতেন। সীমিত আয়ে দুই স্ত্রী, তিন সন্তান এবং বৃদ্ধ মা-বাবার সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। পরিবারের ভাগ্য বদলের আশায় গত বছরের ৫ জুন বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় রাশিয়ায় যান তিনি।
পরিবার জানায়, বিদেশ পাঠাতে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। সেই টাকা জোগাড় করতে জমি বিক্রি করতে হয়েছে, পাশাপাশি ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। বিদেশ যাওয়ার আগে শাহরিয়ার বলেছিলেন, কয়েক বছর কষ্ট করলেই ঋণ শোধ হবে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা যাবে।
রাশিয়ায় একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করলেও ছয় মাসের মাথায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দেশে ফেরার সুযোগ থাকলেও ঋণের চাপ তাকে ফিরতে দেয়নি। এরপরই দালালদের প্রতারণার শিকার হন তিনি।
ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে
পরিবারের অভিযোগ, মস্কোতে এক দালাল প্রথমে আঙুরবাগানে কাজ দেয়ার কথা বলে শাহরিয়ারকে নিয়ে যায়। পরে ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেয়। রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজে স্বাক্ষরও করানো হয়, যার অর্থ তিনি বুঝতে পারেননি।
পরবর্তীতে জানা যায়, সেই কাগজের মাধ্যমে তাকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, যুদ্ধে অংশ নিতে তিনি রাজি ছিলেন না। কিন্তু নানা চাপের মুখে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
মৃত্যুর গুজব, তারপর জীবিতের খোঁজ
গত ২০ জুন স্বজনদের কাছে খবর আসে, ইউক্রেনে ড্রোন হামলায় শাহরিয়ার নিহত হয়েছেন। পরিবার শোকে ভেঙে পড়ে। কিন্তু কয়েক দিন আগে ইউক্রেনের একটি বন্দিশিবির থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে তাকে জীবিত দেখতে পেয়ে নতুন করে আশার আলো জ্বলে ওঠে।
ভিডিওতে শাহরিয়ার জানান, মাত্র তিন দিনের সামরিক প্রশিক্ষণের পর তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। পর্যাপ্ত খাবারও দেয়া হতো না। পরে তিনি ও আরেক বাংলাদেশী নাগরিক কামরুল হাসান যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে ইউক্রেন সীমান্তে পৌঁছালে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে আটক হন। এরপর থেকেই তারা বন্দি।
ভিডিও বার্তায় তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে নেয়া হোক। আমরা খুবই কষ্টে আছি।’
বাবাকে আজও দেখেনি ৯ মাসের সন্তান
শাহরিয়ার বিদেশে যাওয়ার পর তার দ্বিতীয় স্ত্রী খালেদা আক্তারের কোলজুড়ে জন্ম নেয় ছেলে ইরফান আহমেদ। এখন তার বয়স নয় মাস। বাবাকে সে কোনো দিন দেখেনি।
খালেদা আক্তার বলেন, ‘শেষ ফোনে বলছিল, আমার জন্য দোয়া করো। যদি বেঁচে থাকি, আবার দেখা হবে। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। পরে শুনলাম মারা গেছে। এখন ভিডিওতে দেখলাম বেঁচে আছে। আমার স্বামী কাজ করতে গিয়েছিল, যুদ্ধ করতে নয়। আমি শুধু চাই, ও যেন দেশে ফিরে আসে।’
সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা
শাহরিয়ারের পরিবার ইতোমধ্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে লিখিত আবেদন করেছে।
ভগ্নিপতি আনোয়ার হুসাইন জানান, যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে শাহরিয়ারকে আবার রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে—এমন তথ্য তারা পেয়েছেন। তাই দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, ‘লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।’
অপেক্ষার প্রহর
উজান ভাটিপাড়া গ্রামের ছোট্ট বাড়িটিতে এখন প্রতিটি সকাল শুরু হয় একটাই প্রশ্ন নিয়ে—‘আজ কি শাহরিয়ারের কোনো খবর মিলবে?’
মায়ের চোখে অশ্রু, বাবার কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস, স্ত্রীর বুকভরা অপেক্ষা আর বাবাকে না-দেখা শিশুর নীরবতা—সব মিলিয়ে একটি পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই যেন আটকে আছে একটি মাত্র প্রত্যাশায়।
তাদের একটাই আবেদন—বিদেশে কাজের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে যুদ্ধের বিভীষিকায় আটকে পড়া শাহরিয়ার সুমনকে যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়।


