এক সময় আবহমান বাংলার গ্রাম-গঞ্জে উঁচু তালগাছে ঝুলে থাকা বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা ছিল চিরচেনা দৃশ্য। গ্রামের আকাশ ভরে থাকত তাদের কিচিরমিচির কলরবে। তবে কালের বিবর্তন, পরিবেশের অবক্ষয় এবং তালগাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় এখন সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের প্রকৃতি থেকে বাবুই পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
চায়ের রাজধানী খ্যাত ও পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এখানে দিন দিন কমছে তালগাছ, সেইসাথে কমছে বাবুই পাখি ও তাদের শৈল্পিক বাসা।
তবে আশার কথা হলো যতটুকু বাবুই পাখি এখনো টিকে আছে, তারা বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে নারিকেল ও সুপারী গাছকে। শ্রীমঙ্গলসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে এখন নারিকেল ও সুপারী গাছে বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়ছে।
শ্রীমঙ্গল শহরের সবুজবাগ আবাসিক এলাকার বিভিন্ন বাসা-বাড়ির সুপারী গাছে বাসা বাঁধতে দেখা গেছে বাবুই পাখিকে। এছাড়া উপজেলার কালিঘাট ইউনিয়নের ভাড়াউড়া চা বাগানসহ বিভিন্ন গ্রামে নারিকেল ও সুপারী গাছে বাবুই পাখির বাসা দেখা গেছে। এসব দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন স্থানীয় ও দূর-দূরান্তের মানুষ। অনেকেই বাবুই পাখির এই শৈল্পিকভাবে নির্মাণ করা বাসা ক্যামেরাবন্দী করছেন।
ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রমিক সমিরণ হাজরা জানান, কয়েক বছর ধরে তাদের বাড়ির সামনে একটি নারিকেল গাছে বাবুই পাখিরা নিয়মিত বাসা তৈরি করছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা গাছ থেকে ডাব বা নারিকেল এমনভাবে সংগ্রহ করি যাতে পাখিদের কোনো ক্ষতি না হয়। প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে এই বাসাগুলো দেখতে, সেই সাথে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন অনেকে।’
প্রকৃতিপ্রেমী ও সমাজকর্মী খোকন থৌনাওজাম নয়া দিগন্তকে জানান, সবুজবাগ এলাকায় যেখানে তিনি বসবাস করেন, সেই বাসার পাশে সুপারী গাছে বেশ কয়েকটি বাবুই পাখির বাসা তাকে বেশ আকৃষ্ট করে।
তিনি বলেন, ‘বাসা থেকে প্রতিদিন বের হওয়ার সময় বাবুই পাখির বাসা বানানোর শৈল্পিক দৃশ্য অবলোকন করি। মাঝে মধ্যে তাদের কারুকাজ ক্যামেরাবন্দী করি, তাদের বাসা বুনার দৃশ্য দেখতে অনেক ভালো লাগে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এক সময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি তালগাছে বাবুই পাখির বাসা দেখা যেত। কিন্তু এখন তালগাছ ও বাবুই পাখি দু’টিই কমে যাচ্ছে। গ্রাম ঘুরেও এখন তালগাছ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।’
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের শ্রীমঙ্গল রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বাবুই পাখির প্রধান আবাসস্থল তালগাছ। তালগাছ কমে যাওয়ায় তারা বাধ্য হয়েই নারিকেল ও সুপারী গাছে বাসা তৈরি করছে। তারা মূলত যেখানে নিরাপদ অনুভব করবে সেখানেই বাসা বাঁধবে। যেকোনো পাখিই কমফোর্ট স্থানেই বাসস্থান করতে চায়, সেটা যে গাছই হোক।’
মৌলভীবাজারের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সারোয়ার নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমরা ফরেস্ট এলাকা নিয়ে কাজ করি, তালগাছ সাধারণত লোকালয় ও সড়কের পাশে রোপণ করা হয়। তাই প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এবং বাবুই পাখিকে টিকিয়ে রাখতে আমাদের সচেতন হতে হবে, পাশাপাশি তালগাছ রোপণের উদ্যোগ নিতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তালগাছ কমে যাওয়ায় শুধু যে বাবুই পাখি অন্যগাছে বাসা বুনছে তাই নয়, এতে বজ্রপাতের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই সবাই নিজ উদ্যোগে যদি একটি করে তালগাছ রোপণ করি, তাহলে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে।’
উল্লেখ্য, বাবুই পাখি প্রকৃতির ‘ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে পরিচিত। খড়, পাতা ও লতা দিয়ে তারা নিপুণভাবে উল্টানো কলসির মতো বাসা তৈরি করে। দলবদ্ধভাবে বসবাস করা এই পাখি সাধারণত বীজ, ধান, পোকামাকড় ও ফুলের মধু খেয়ে বেঁচে থাকে। মে থেকে সেপ্টেম্বর তাদের প্রজননকাল।
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাবুই পাখি সংরক্ষণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শুধু বইয়ের পাতাতেই এই শিল্পী পাখির নাম খুঁজে পাবে।


