নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদীতে চলছে পাথর লুট। বিশেষ যন্ত্র ও শ্যালো ইঞ্জিনের সাহায্যে নদীর তলদেশের বালু সরিয়ে গভীর গর্ত করে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে।
শতাধিক ইঞ্জিনচালিত নৌকা প্রতিদিন নদীর বিভিন্ন অংশে অবস্থান করে প্রকাশ্যেই চালাচ্ছে এ কর্মকাণ্ড। পরে ট্রাক্টরে করে এসব পাথর নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন মজুদস্থলে। সেখান থেকে বিক্রি করা হচ্ছে ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের কাছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিস্তা বাজার, তেলীর বাজার, চরখড়িবাড়ী, বাইশপুকুরী, দোহলপাড়া, কালীগঞ্জ ও ভেন্ডাবাড়ীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় অন্তত ২০টি সক্রিয় টিমের মাধ্যমে ১৭টি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এ অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। নদীর বিভিন্ন অংশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে সিন্ডিকেটগুলো নির্বিঘ্নে পাথর উত্তোলন করছে।
সরেজমিনে টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের তেলীর বাজার সংলগ্ন গ্রোয়িং এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার বিভিন্ন অংশে সারি সারি ইঞ্জিনচালিত নৌকা। শ্রমিকরা লোহার বিশেষ যন্ত্র ও শ্যালো ইঞ্জিনের সাহায্যে নদীর তলদেশের বালু সরিয়ে গভীর গর্ত তৈরি করছেন।
এরপর ওই গর্ত থেকে পাথর তুলে নৌকায় বোঝাই করা হচ্ছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, প্রতিটি নৌকা দিনে প্রায় ২০০ সিএফটি পাথর উত্তোলন করছে। দোহলপাড়া ও ছোটখাতা এলাকাতেও একইভাবে চলছে পাথর তোলার কাজ।
উত্তোলিত পাথর প্রথমে নদীর পাড়ে নামানো হচ্ছে। পরে ট্রাক্টরে করে তা নেয়া হচ্ছে শুটিবাড়ী বাজারের টেপাখড়িবাড়ী রোডের আশপাশের বিভিন্ন স্থানে এবং ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনে তিস্তা নদীর প্রধান সেচ খালের পাশে। সেখানে পাথরের বিশাল স্তূপ তৈরি করে প্রকাশ্যেই বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীর কাছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতি সিএফটি পাথর নদীর পাড়ে ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে সংগ্রহ করা হলেও মজুদস্থল থেকে তা বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১৩০ টাকা দরে। শতাধিক নৌকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পাথর উত্তোলন হওয়ায় এ অবৈধ বাণিজ্যে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে প্রশাসনের অভিযান হলেও বন্ধ হচ্ছে না পাথর উত্তোলন। অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই ফের আগের অবস্থায় ফিরে যায় নদী। ফলে একদিকে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব, অন্যদিকে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও তলদেশের গঠন পরিবর্তনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নদীর তলদেশ থেকে নির্বিচারে বালু সরিয়ে পাথর উত্তোলনের কারণে তিস্তার স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এর প্রভাব পড়ছে নদীতীরেও। কোথাও কোথাও বাড়ছে নদীভাঙনের তীব্রতা। নদীভাঙনে ইতোমধ্যে ফসলি জমি, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, ডিমলা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের অন্তত ১৯টি এলাকায় নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতি বছর নদীর গর্ভে বিলীন হচ্ছে আবাদি জমি ও বসতভিটা।
তাদের আশঙ্কা, নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ভাঙনের তীব্রতা আরো বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘নদী থেকে পাথর উত্তোলন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসনের। আমাদের দায়িত্ব নদী রক্ষা ও ভাঙন প্রতিরোধমূলক কাজ করা।’
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: ইমরানুজ্জামান বলেন, ‘এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা হয়েছে। শিগগিরই বড় পরিসরে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ করা হবে। এ কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে।’
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন— প্রকাশ্য দিবালোকে শতাধিক নৌকা দিয়ে প্রতিদিন পাথর উত্তোলন চললেও এর নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা কবে?
তাদের দাবি, শুধু অভিযান নয়, পাথর উত্তোলনের সাথে জড়িত সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে তিস্তার নদীতল ও তীর রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।


