গৌরীপুরে আন্দোলনের আগুন, গুলির শব্দের সাথে ঝড়ে যায় ৩টি প্রাণ

২০ জুলাই কারফিউর মধ্যেই কলতাপাড়া এলাকায় শিক্ষার্থী, তরুণ এবং সাধারণ মানুষ জড়ো হতে থাকেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন হয়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
জুলাই শহীদ রাকিব, বিপ্লব ও জুবায়ের
জুলাই শহীদ রাকিব, বিপ্লব ও জুবায়ের

২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে আছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তার প্রভাব পড়ে ময়মনসিংহের গৌরীপুরেও। ২০ জুলাই, কারফিউর মধ্যেই গৌরীপুর উপজেলার কলতাপাড়া এলাকায় সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও হতাহতের ঘটনা স্থানীয় মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

সকালের দিকে কলতাপাড়া ও আশপাশের এলাকায় শিক্ষার্থী, তরুণ এবং সাধারণ মানুষ জড়ো হতে থাকেন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং সড়কে অবস্থান নেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। এরপর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। আতঙ্কে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যান, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং পুরো এলাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হন। আহতদের গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে ময়মনসিংহ মেডিক‌্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাকিব (১৮), বিপ্লব হাসান (১৯) ও জুবায়েরের (১৮) মৃত্যু হয়। তাদের মৃত্যু শুধু পরিবার নয়, পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নামিয়ে আনে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, আহতদের অনেকের শরীরে গুলির আঘাত ও স্প্লিন্টারের চিহ্ন ছিল। গুরুতর আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়।

ঘটনার পর গৌরীপুরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং যান চলাচলও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়।

পরে এই ঘটনায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে বিচার দাবি করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলাও হয়, যেখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীসহ সরকা‌রের কয়েকজন মন্ত্রী, ব্যক্তি ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলমান।

কলতাপাড়ার ২০ জুলাইয়ের ঘটনা শুধু একটি স্থানীয় সংঘর্ষ নয়; এটি জুলাই আন্দোলনের সময় ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। নিহতদের পরিবার এখনো ন্যায় বিচারের প্রত্যাশায় রয়েছে। আহতদের অনেকেই দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েছেন এবং কেউ কেউ স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন।

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও কলতাপাড়ার মানুষের স্মৃতিতে সেই দিনের আতঙ্ক, গুলির শব্দ, আহতদের আর্তনাদ এবং নিহতদের বিদায় আজও অম্লান। ইতিহাসের সেই দিনটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু একটি তারিখ নয়, বরং একটি বেদনাদায়ক স্মৃতি হয়ে থাকবে।