নীলফামারীর সৈয়দপুরে সার না পেয়ে বিক্ষোভ করেছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা। রোববার (৯ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার কামারপুকুর বাজারে মেসার্স আফজাল ব্রাদার্স ডিলার পয়েন্টের সামনে বিক্ষুব্ধ কৃষকরা প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করেন।
বিক্ষোভকারীরা ডিলারের বিরুদ্ধে গোপনে সার বিক্রি করা এবং ডিলার পয়েন্ট সব সময় বন্ধ রাখার অভিযোগ করেন। পরে উপজেলা কৃষি অফিসারের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
কামারপুকুর ইউনিয়নের কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, আফজাল ব্রাদার্সের এই সার ডিলার দোকান বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকে। এতে আমরা সকাল-বিকাল যখনই সারের জন্য আসি তখনই খালি হাতে ফিরে যেতে হয়। ফলে বার বার আসায় যেমন অর্থ খরচ হয়, তেমনি সময়ও নষ্ট হয়। আর সময় মতো সার না পাওয়ায় ফসলের ক্ষতি হয়। এখন ধান চাষের মৌসুম, জমিতে সার দেয়ার সময়। কিন্তু সার মিলছে না। এতে আবাদ নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছি। সারা বছরই এই ডিলার সার দেয়ার ক্ষেত্রে কৃষকদের দুর্ভোগে ফেলে।
আরেক কৃষক জুয়েল সরকার বলেন, এই ডিলার পয়েন্টে এসে দোকান বন্ধ পেয়ে মোবাইল করে ডেকে এনে সার নিতে হয়। তারপরও অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। আবার অনেক সময় সার নাই বলে ফিরিয়ে দেয়। অথচ উপজেলার অন্যান্য এলাকায় সব সময়ই সার মজুদ থাকে এবং কৃষক প্রয়োজন হলেই কিনতে পারে। মূলত বরাদ্দের সার তুলে গোপনে বিক্রি করে দেয়া হয়। সেজন্য কৃষক চাহিদা মতো সার পায় না। এভাবে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে কালোবাজারে চড়া দামে সার বিক্রি করে কৃষকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটা সিন্ডিকেট।
আহমাদুল নামে এক কৃষক বলেন, কয়েক দিন থেকে আমরা কৃষকরা সারের জন্য এসে বেশ হয়রানির শিকার হচ্ছি। তাই আজ ডিলার পয়েন্টের সামনে সকাল থেকে আসা কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অবস্থান নিয়েছি। ডিলার আফজাল খাঁনকে বার বার মোবাইল করা হলেও কেউ আসেনি এবং দোকান খোলেনি। পরে কৃষকদলের উপজেলা সভাপতি মনির সরকারকে জানাই। তিনিও ডিলারকে মোবাইল করেন। কিন্তু তারপরও এক ঘণ্টাতেও ডিলার পয়েন্ট খোলা হয়নি। বাধ্য হয়ে উপজেলা কৃষি অফিসারকে জানানো হয়।
পরে উপজেলা কৃষি অফিসার এসে ফোন করলে ডিলার আফজাল খাঁনের ছেলে রাজা খাঁন আসেন। এরপর দোকান খোলা হলে দেখা যায়, সেখানে সামান্য কয়েক বস্তা সার আছে।
এ সময় রাজা খাঁন বলেন, চলতি মাসের সার এখনো সরকারি গুদাম থেকে তোলা হয়নি। এ কারণে পয়েন্ট বন্ধ রাখা হয়েছে। সার তোলার পর নিয়মিত খোলা হবে।
কবে সার তুলবেন জানতে চাইলে তিনি সুনিশ্চিত করে কিছু বলেননি। এতে হট্টগোল শুরু হয়। পরে কৃষি অফিসার তাগাদা দিয়ে আগামীকালই সার তুলে সকাল থেকে বিক্রি শুরু করার আশ্বাস দেন।
উপজেলা কৃষকদলের সভাপতি মনির সরকার বলেন, এভাবে সময় মতো সার না তোলায় এবং ডিলার পয়েন্ট বন্ধ রাখায় কৃষকরা চাহিদা মতো সার পাচ্ছেন না। অথচ সরকার পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু তা কৃষক পর্যায়ে পৌঁছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত ডিলাররা নিয়মমাফিক বিক্রি কার্যক্রম পরিচালনা না করায় দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এতে কৃষকদের মাঝে ক্ষোভ দেখা দিচ্ছে এবং সরকারের সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে। যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তাই কৃষি অফিসারকে সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলেছি।
মেসার্স আফজাল ব্রাদার্স ডিলার পয়েন্টের স্বত্বাধিকারী আফজাল খাঁনের ছেলে রাজা খাঁন বলেন, মূলত আমরা এই ডিলার পয়েন্ট নিজে তদারকি করার সময় পাই না। লোক রেখে বিক্রি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। শুধু এলাকার কৃষকদের সহযোগিতা করার মানসিকতা থেকে এই ডিলারশিপ নেয়া। এখন কর্মচারীদের অবহেলার কারণে আমাদের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার উপক্রম। তাই ডিলারশিপ ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। কৃষি অফিসারকে জানিয়েছি সম্ভব হলে অন্য কাউকে এই পয়েন্টের ডিলারশিপ দেয়ার জন্য। তাহলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।
উপজেলা কৃষি অফিসার ধীমান ভূষণ বলেন, ধান চাষের এখন ভরা মৌসুম। এ সময় সারের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করা হয়েছে। ডিলার পয়েন্ট কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে যথাযথ নির্দেশ দেয়াসহ সার্বিক তদারকি অব্যাহত রাখা হয়েছে। কিন্তু তারপরও এই পয়েন্টে বরাদ্দকৃত সার তোলেনি। এজন্য ডিলারকে সতর্ক করা হয়েছে এবং আগামীকালের মধ্যেই সার তুলে বিক্রি শুরু করার নির্দেশ দিয়েছি। এই কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে কৃষি বিভাগ থেকে সর্বদা নজরদারি বহাল আছে।
তবে একটা সূত্রের অভিযোগ, সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের ঢেলাপীর উত্তরা আবাসন এলাকায় একজন অবৈধ সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীর কাছেই সৈয়দপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার সার ডিলাররা গোপনে বরাদ্দপ্রাপ্ত সার বিক্রি করেন। ঢেলাপীর তেল পাম্পের পেছনে একটা চার তলা ভবনে তার বিশাল গুদাম আছে। এই গুদামেই মজুদ হয় কৃষকের জন্য সরকারের দেয়া সার। কৃষক ডিলার পয়েন্টে সার না পেয়ে এই কালোবাজারির শরণাপন্ন হলে চড়া দামে বিক্রি করে সার।
কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে জানলেও নির্বিকার। সে কারণে কৃষককে জিম্মি করে ডিলাররা ও এই কীটনাশক বিক্রেতারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে।


