চট্টগ্রামের নবগঠিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার সদর দফতর নির্ধারণ ও ভৌগোলিক সীমানা পুনঃবিন্যাসে প্রশাসনিক নথিপত্র এবং ব্যবহৃত মানচিত্রে চরম অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নথি, গণশুনানির মূল সুপারিশ ও চূড়ান্ত প্রশাসনিক মানচিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে— মাঠপর্যায়ের গণশুনানির তোয়াক্কা না করে এবং কোনো প্রকার প্রশাসনিক শুনানি ছাড়াই সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ইউনিয়নকে নতুন উপজেলায় যুক্ত করা হয়েছে। একই সাথে নথিপত্র জালিয়াতি ও বিতর্কিত মানচিত্রের মাধ্যমে সদর দপ্তরের স্থান পরিবর্তন করার চক্রান্ত চলছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করেছেন। তবে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
চলতি বছরের ১ জুলাই ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা ঘোষণার পর থেকেই এর প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক বিন্যাস নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও মতবিরোধ দেখা দেয়। উত্তরাঞ্চলের বাগানবাজার, দাঁতমারা ও নারায়ণহাট এবং দক্ষিণের সুয়াবিল ইউনিয়নের বাসিন্দারা ইতোমধ্যে আন্দোলনে নেমেছেন। তারা সড়ক অবরোধ, হরতাল, কালো পতাকা প্রদর্শন, বিক্ষোভ মিছিল, স্মারকলিপি প্রদান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন।
প্রশাসনিক বৈষম্য ও গণশুনানির রিপোর্ট উপেক্ষার অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভৌগোলিক বিস্তৃতির কারণে ফটিকছড়ি উপজেলা সদর থেকে উত্তরাঞ্চলের দূরত্ব প্রায় ৩০ থেকে ৬০ কিলোমিটার। স্বাধীনতার পর থেকে প্রশাসনিক অবকাঠামোসহ অধিকাংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে ওঠায় উত্তরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার। জনগণের এই ভোগান্তি নিরসনে বাগানবাজার, দাঁতমারা, নারায়ণহাট ও ভুজপুর— এই চার ইউনিয়ন নিয়ে পৃথক উপজেলা গঠনের দাবি ওঠে।
এই দাবির প্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চার ইউনিয়নে আনুষ্ঠানিকভাবে গণশুনানি সম্পন্ন করে স্থানীয় প্রশাসন।
অভিযোগ উঠেছে, ওই শুনানিতে অন্তর্ভুক্ত না থাকা সত্ত্বেও পরবর্তীতে নিয়মবহির্ভূতভাবে হারুয়ালছড়ি ও সুয়াবিল ইউনিয়নকে নতুন উপজেলায় যুক্ত করা হয়। এই দুই ইউনিয়নের অধিবাসীদের কাছ থেকে কোনো প্রকার প্রশাসনিক মতামত বা শুনানি নেয়া হয়নি।
নথি ও মানচিত্রে জালিয়াতির চিত্র
২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে উত্তরাঞ্চলের ‘জুজখোলা মৌজা’য় নতুন উপজেলার সদর দফতর স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়, যা জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) নথিতেও উল্লেখ ছিল। কিন্তু প্রস্তাবটি সচিবালয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগেই অলৌকিকভাবে নথিপত্র ও মানচিত্রে পরিবর্তন আনা হয়।
প্রতিবেদকের সংগৃহীত প্রশাসনিক নথি ও একাধিক মানচিত্র পর্যালোচনায় দুটি ভিন্ন মানচিত্রের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে:
প্রথম (প্রকৃত) মানচিত্র: গণশুনানির সুপারিশ অনুযায়ী উত্তরাঞ্চলের জুজখোলা মৌজাকে কেন্দ্র করে ভৌগোলিক সীমানা ও প্রশাসনিক কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছিল।
দ্বিতীয় (পরিবর্তিত ও বিতর্কিত) মানচিত্র: পরবর্তীতে যুক্ত করা এই মানচিত্রে সীমানা অপরিবর্তিত রেখে সদর দপ্তর সরিয়ে নেয়া হয় দক্ষিণাঞ্চলের ‘পশ্চিম ভুজপুর’ মৌজায়।
স্থান পরিবর্তনকে যৌক্তিক দেখাতে পরিবর্তিত ও বিতর্কিত মানচিত্রটিতে ইউনিয়নের ভৌগোলিক অবস্থানও ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তৎকালীন ইউএনও, এসিল্যান্ড ও ডিসি স্বাক্ষরিত ওই নথির মানচিত্রে দেখানো হয়— বাগানবাজারের সীমানা উত্তর-পশ্চিম পাশে দাঁতমারা, নারায়ণহাট ও ভুজপুরের সাথে লাগোয়া। অথচ বাস্তবে বাগানবাজারের সাথে কেবল দাঁতমারার সীমান্ত সংযোগ রয়েছে; নারায়ণহাট বা ভুজপুরের সাথে এর কোনো সীমান্তই নেই। স্থানীয়রা একে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ‘জালিয়াতি মানচিত্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
বিকেন্দ্রীকরণের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত
দূরত্বের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমান উপজেলা সদর থেকে সুয়াবিল ও হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের দূরত্ব মাত্র ২ থেকে ৪ কিলোমিটার। ফলে ফটিকছড়ি সদর হাতের কাছে হলেও নতুন বিন্যাসে তাদের ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরবর্তী ভুজপুরে যাতায়াত করতে হবে।
নাজিরহাট কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ নুরুল হুদা বলেন, “ফটিকছড়ি উপজেলা সদর সুয়াবিলবাসীর জন্য একেবারেই কাছে। তাদের অহেতুক ১০-১৫ কিলোমিটার দূরের ভুজপুরে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।”
অন্যদিকে, বাগানবাজারের অধিবাসীদের বর্তমানে উপজেলা সদরে যেতে প্রায় ৫২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। নতুন সদর দফতর যদি পশ্চিম ভুজপুরে স্থাপন করা হয়, তবে তাদের তখনও প্রায় ৪২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। বর্তমান ফটিকছড়ি পৌরসভা ও প্রস্তাবিত ভুজপুর সদরের দূরত্ব মাত্র সাড়ে আট কিলোমিটার। ফলে এত কাছাকাছি দুটি প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করা হলে প্রান্তিক এলাকার মানুষের ভোগান্তি কমবে না, বরং সরকারের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব (উপজেলা-১) হেলেনা পারভীন বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমার স্পষ্ট জানা নেই। নথিপত্র পর্যালোচনা করে বিস্তারিত বলতে পারব।’ এরপর তিনি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ফোন রেখে দেন।
মাঠ প্রশাসনের প্রতিবেদন, ভৌগোলিক অবস্থান ও মানচিত্রের এই দূরভিসন্ধিমূলক অসামঞ্জস্য দূর করে দ্রুত সঠিক সীমানা নির্ধারণ এবং জুজখোলা মৌজায় সদর দফতর বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ।


