কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় স্কুলছাত্রীর ভগ্নিপতির ভাড়াটে বাড়িতে ঢুকে ছাত্রীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে অনিক মিয়া (১৯) মিয়া নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার ছয়সূতী ইউনিয়নের মাধবদী গ্রামের কান্দারবাড়ির কৃষক মো: মস্তোফা মিয়ার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী উপজেলার ছয়সূতী ইউনিয়ন হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। দিনের আলোয় প্রকাশ্যে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় এলাকায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্ত অনিক মিয়া কুলিয়ারচর পৌর এলাকার পূর্ব গাইলকাটা গ্রামের খোকন মিয়া ও মোছা: শারমিন দম্পতির ছেলে। সে একজন অটোরিকশাচালক। ছোটবেলা থেকেই সে মাধবদী গ্রামে নানার বাড়িতে থেকে বড় হয়ে সেখানেই বসবাস করে আসছে।
স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, স্কুলে যাওয়া-আসার পথে অনিক মিয়া প্রায় সময় ওই স্কুলছাত্রীকে (১২) উত্ত্যক্ত করে আসছিল। প্রতিদিনের ন্যায় মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে স্কুলে যাওয়ার পথে অভিযুক্ত অনিক মিয়া কর্তৃক ইভটিজিংয়ের শিকার হয় ওই ছাত্রী।
এ সময় ওই ছাত্রী প্রতিবাদ করে বাড়ি এসে তার ভগ্নিপতিসহ বড় বোন ও মা-বাবাকে এ ঘটনা জানায়।
শ্যালিকার কাছ থেকে বিষয়টি জেনে ছাত্রীর ভগ্নিপতি অভিযুক্ত অনিক মিয়াকে পেয়ে বলেন, আর যাতে তার শ্যালিকাকে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথে উত্ত্যক্ত ও বিরক্ত না করে। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে অভিযুক্ত অনিক মিয়া মঙ্গলবার সকালে লোহার রড নিয়ে ছাত্রীর ভগ্নিপতির ভাড়াটে বাড়ির আঙিনায় এসে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে ছাত্রীর ভগ্নিপতি ও ছাত্রীর ওপর হামলা চালায় এবং ছাত্রীকে লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করে।
পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে অভিযুক্ত অনিক মিয়ার হাত থেকে তাদের রক্ষা করে। যাওয়ার সময় অনিক মিয়া ওই ছাত্রী ও ছাত্রীর পরিবারের সদস্যসহ ভগ্নিপতিকে শাসিয়ে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়।
ঘটনার পর থেকেই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
পরিবারের দাবি, ঘটনার পর থেকে শিশুটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। যেকোনো সময় আবারো হামলার আশঙ্কায় পুরো পরিবারসহ ছাত্রীর বোন ও ভগ্নিপতি উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। লেখাপড়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে শিশুটির।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, একজন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী শুধু নিজের সম্মান রক্ষায় প্রতিবাদ করেছিল। অথচ সেই প্রতিবাদের জেরে তার ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। একজন স্কুলছাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। তারা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় স্কুলছাত্রীর বড় বোন বাদী হয়ে বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেলে অভিযুক্ত অনিক মিয়ার বিরুদ্ধে কুলিয়ারচর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
লিখিত অভিযোগ পেয়ে বুধবার বিকেলেই কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীন অভিযোগ তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সুজন বিশ্বাসসহ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অভিযুক্ত অনিক মিয়াকে গ্রেফতারের চেষ্টা করেন।
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত অনিক মিয়া পলাতক থাকায় তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী ছাত্রীর ভগ্নিপতি বেশ কয়েকটি ভিডিও দেখিয়ে বলেন, ‘আমার শ্যালিকাকে স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে অভিযুক্ত অনিক মিয়া উত্ত্যক্ত ও অশালীন ভাষায় কথাবার্তা বলায় আমি ও আমার শ্যালিকা প্রতিবাদ করেছি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে অনিক মিয়া লোহার রড নিয়ে আমার ভাড়াটে বাসায় এসে আমাদের ওপর হামলা করে মারধর করে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে অভিযুক্ত অনিক মিয়ার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
এ ব্যাপারে স্থানীয় ছয়সূতী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো: মিনার মিয়া ও ওয়ার্ড যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি মো: কাইয়ুম মিয়া বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও দেখে বুঝতে বাকি নেই, কী কারণে ওই ছাত্রীকে মারধর করা হয়েছে। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা ও শোনা যাচ্ছে ওই ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত ও ইভ টিজিং করার বিষয়টি।’
তারাও এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে অভিযুক্ত অনিক মিয়ার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
অভিযুক্তের আপন মামা মৎস্যজীবী মো: কাজল মিয়া বলেন, ‘আমার ভাগিনা অনিক মিয়া ওই স্কুলছাত্রীকে দুটি বাড়ি মারতে দেখেছি। কিন্তু কেন, কী কারণে মেরেছে তা আমি জানি না।’
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত অনিক মিয়া পলাতক থাকায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে ছয়সূতী ইউনিয়ন হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আব্দুল মালেকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাকে কেউ অবগত করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এ ব্যাপারে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীন ছাত্রীর বড় বোন কর্তৃক একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। অভিযুক্তকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো: ইয়াছিন খন্দকারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি অবগত হয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’


