এক ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন, আরেক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে— এ যেন সংবিধানের ধারাবাহিকতার নিয়ম! শ্রাবণের শেষে রোদের তাপে ভ্যাপসা গরমে ঝালকাঠির চার উপজেলায় ঘনঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
দিন-রাত পালাক্রমে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিদ্যুৎ সঙ্কটে পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ওয়ার্কশপ ও শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) অধীনে ২০৫ কিমি এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস)-র অধীনে ৩,৭১৪.০০৪ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন রয়েছে। এতে গ্রাহকসংখ্যা রয়েছে প্রায় সোয়া দুই লাখ।
ঝালকাঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস) এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)-র আওতায় জেলায় প্রায় সোয়া দুই লাখ গ্রাহক রয়েছেন। জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৩৭.৫ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় রোটেশন পদ্ধতিতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ১৪ থেকে ২০ মেগাওয়াট। পিক আওয়ারে এ চাহিদা বেড়ে ২২ থেকে ২৬ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। অন্যদিকে জেলা শহর ও ওজোপাডিকোর আওতাধীন এলাকায় দৈনিক চাহিদা প্রায় ১০.৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বরিশাল থেকে ৩৩ কেভি সঞ্চালন লাইনে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতি থাকায় বাধ্য হয়ে রোটেশন পদ্ধতিতে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আবার কখনো অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থরা। রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।
মমতাজ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী মো. শাহ আলম বলেন, “বিদ্যুৎ বিভ্রাটে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিঘ্ন ঘটছে। বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু রাখতে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”
ব্যবসায়ী মো: বাদশা খলিফা বলেন, ‘ঘনঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ফ্রিজ, কম্পিউটারসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্র ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। এতে কাজের ক্ষতির পাশাপাশি বাড়ছে অতিরিক্ত খরচ।’
শিক্ষার্থী মো: নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে পাওয়ায় পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ ছাড়া দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করা সম্ভব হচ্ছে না।’
কারখানা মালিক মো: বশির রাড়ী বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে মেশিন চালানো যায় না। ফলে শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হয় এবং সময়মতো কাজ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।’
ঝালকাঠি ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো: মতিউর রহমান বলেন, ‘ওজোপাডিকোর আওতায় জেলায় প্রায় ২৭ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। নয়টি ফিডারের মাধ্যমে তাদের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় রোটেশন পদ্ধতিতে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। সরবরাহ বাড়লে লোডশেডিংও কমে আসবে।’
ঝালকাঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম (প্রশাসন) মো: আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক চাহিদা ১৪ থেকে ২০ মেগাওয়াট। পিক আওয়ারে তা ২২ থেকে ২৬ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। কিন্তু জাতীয় গ্রিড ও উপকেন্দ্র থেকে চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পাওয়ায় নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’
এদিকে ঝালকাঠি থেকে বরিশাল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩৩ কেভি সঞ্চালন লাইনে বছরে কয়েক দফা ট্রিমিং ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হলেও ঝড়-বৃষ্টির সময় সড়কের পাশের গাছের ডাল বৈদ্যুতিক তারের ওপর পড়ে লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে হঠাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে জনদুর্ভোগ আরো বাড়ে।


