দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকা হিলিতে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। শুধু মাদক বহনকারী বা সেবনকারী নয়, এর নেপথ্যে থাকা সরবরাহকারী ও ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করতেও চলছে নজরদারি।
এদিকে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের এমন অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল। এমন অভিযান যেন নিয়মিত হয়—সেই দাবি তাঁদের।
হাকিমপুর থানা সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৮ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৩ আগস্ট পর্যন্ত মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে ৮৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে মাদক সেবনকারী ২৪২ জনকে আটক করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।
এছাড়া মাদকসেবনের দায়ে ২১০ জনকে আটক করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। সর্বমোট ৪৫২ জনকে আটক করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানিয়েছে থানা পুলিশ।
হাকিমপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সিঅ্যান্ডএফ অ্যাজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘হাকিমপুর উপজেলা একটি সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে মাদকের বিস্তার অনেক। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় হাকিমপুর থানা পুলিশ যে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, আমরা হাকিমপুর থানা পুলিশকে ধন্যবাদ জানাই। মাদকের সাথে কোনো আপস নেই। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান চালাতে যে কোনো সহায়তা প্রয়োজন, পুলিশকে আমাদের পক্ষ থেকে সেই সহায়তা করা হবে। পুলিশের এমন অভিযান অব্যাহত থাক—সেটা আমরা চাই।’
হাকিমপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রফতানিকারক গ্রুপের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন শিল্পী বলেন, ‘মাদকসেবীদের চিহ্নিত করার জন্য উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এবং মাসিক সভায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক ধরনের ডিভাইস বা মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে হিলির মাদক প্রবণতা আরো কমে আসবে, সেই সাথে মাদকসেবীদের চিহ্নিত করা যাবে। বর্তমান উপজেলা প্রশাসন ও থানার ওসি মাদকের বিরুদ্ধে যে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, আমরা এজন্য পুলিশ প্রশাসনকে সাধুবাদ জানাই। তাদের এই কাজে আমরাও প্রশাসনকে সহযোগিতা করছি।’
বর্তমানে হিলির মাদক অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। প্রশাসনের এই অভিযান অব্যাহত থাকলে মাদক আরও নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলেও মনে করেন তিনি।
হাকিমপুর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লিয়াকত আলী বলেন, ‘মাদক নির্মূলে শুধু পুলিশ নয়, প্রশাসনের একার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। মাদকের ভয়াল থাবা থেকে আমাদের সন্তানদের বাঁচাতে ও দেশকে রক্ষা করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, মাদকের বিরুদ্ধে সকলকে সতর্ক হতে হবে। কারা কারা মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ও কারা মাদক সেবন করে—সেই তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করতে হবে। সেই সাথে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভা করতে হবে, এর কুফল সম্পর্কে সকলকে অবগত করতে হবে। সবাই যদি নিজ নিজ স্থান থেকে এগিয়ে আসে, তবেই হিলিতে মাদক নিয়ন্ত্রণে আসবে।’
হাকিমপুর উপজেলার আলীহাট ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আল ইমরান বলেন, ‘মাদকের নিয়ন্ত্রণে পুলিশ যে কার্যক্রম চালাচ্ছে তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তাদের নিয়মিত অভিযান ও কঠোর তৎপরতা এলাকার যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মঙ্গল বয়ে আনছে। আগে আমাদের গ্রামগঞ্জে মাদকের ভয়াল থাবা ছিল, হাত বাড়ালেই সহজে মাদক পাওয়া যেত। তবে পুলিশের কঠোর তৎপরতা ও অভিযানের কারণে পরিস্থিতির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। আগে মাদক যতটা সহজলভ্য ছিল, এখন তা অনেকটাই কঠিন হয়ে গেছে। তবে বর্তমানে যারা দুই-একজন মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করা সম্ভব হবে। আমরা চাই, পুলিশের এমন কার্যক্রম অব্যাহত থাকুক এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের সমাজ সম্পূর্ণভাবে মাদকমুক্ত হোক।’
হাকিমপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। সেই মোতাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায়, পুলিশ সুপারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের সহযোগিতায় মাদক নিয়ন্ত্রণে হাকিমপুর থানা পুলিশ নিয়মিতভাবে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আসছে। যেহেতু হিলি একটি সীমান্তবর্তী এলাকা, এখানে মাদকের একটা সহজলভ্যতা থাকে—সেই বিষয়টি মাথায় রেখে শুরু থেকেই কাজ করে আসছি। মাদকের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় নেই, যারই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। সেই সাথে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়াতে মসজিদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্কুল-কলেজে মাদকবিরোধী সেমিনার করা হচ্ছে। যদি কেউ মাদক ব্যবসায়ীদের ছাড়করণের কোনো ধরনের সুপারিশ বা তদ্বির করেন, তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়াও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িতদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় হাকিমপুর থানা এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।’
হাকিমপুর-ঘোড়াঘাট সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আ ন ম নিয়ামত উল্লাহ্ বলেন, ‘মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি। এটি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে। সীমান্তবর্তী উপজেলা হওয়ার কারণে এই উপজেলাতে সহজেই মাদক পাওয়া যায়। পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে পুলিশের পাশাপাশি সচেতন সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে সীমান্তঘেঁষা হাকিমপুরের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক নিয়ন্ত্রণকে পুলিশের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ফলে শুধু খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারীদের আটক নয়, মাদকের সরবরাহ ব্যবস্থার মূল হোতাদের শনাক্ত করাই এখন বড় পরীক্ষা।’


