যথাযোগ্য মর্যাদা ও দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি) ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উদযাপন করা হয়েছে।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল ৫.৩৪ মিনিটে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে প্রশাসনিক ভবনের সম্মুখে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো: এনামউল্যার নেতৃত্বে জুলাই গণঅভ্যুত্থান র্যালি বের করা হয় এবং র্যালিটি জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ এসে শেষ হয়।
র্যালি শেষে জুলাই-আগস্টের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন ভিসি অধ্যাপক ড. মো: এনামউল্যা। এ সময় তার সাথে ছিলেন প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মো: নওশের ওয়ান, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো: আবু হাসান, ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. আবুল কালাম ও ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. এস এম এমদাদুল হাসান।
পরে ক্রমান্বয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন ডিন কাউন্সিল, হল সুপার কাউন্সিল, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক পরিষদ, ইউট্যাব, জিয়া পরিষদ, সাদা দল, অফিসার্স ফোরাম, জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তা পরিষদ, জাতীয়তাবাদী কর্মচারী পরিষদ, হাবিপ্রবি ছাত্রদল ও হাবিপ্রবি স্কুল।
এরপর জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ভিসির বাণী পাঠ ও বিতরণ করা হয়। বাণী পাঠ করেন ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা বিভাগের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক ড. মো: নিজাম উদ্দীন।
বাণীতে ভিসি অধ্যাপক ড. মো: এনামউল্যা ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী মহান বীর শহীদদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন। তিনি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী শহিদ আবু সাঈদকে। যিনি স্বৈরাচারের পেটোয়া বাহিনীর বুলেটের সামনে নিজের বুক চিতিয়ে বীরত্ব ও সাহসীকতার সাথে জীবন দিয়ে অমর হয়ে আছেন।
শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করেন একই দিনে গুলিবিদ্ধ চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিমকে। যার গুলিবিদ্ধ হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়া মাত্র আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে।
আরো শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন মানবিকতা, সাহস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধকে। যিনি ফ্যাসিস্ট শাসক শ্রেণির হিংস্র ও সুসজ্জিত পেটোয়া বাহিনীর বুলেটের তোয়াক্কা না করে আন্দোলনরত তৃষ্ণার্ত ও আহত ছাত্র-জনতাকে পানি ও খাবার দিতে গিয়ে বুলেট বিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
ভিসি বলেন, ‘মৃত্যু অবধারিত জেনেও নিজেদের জীবনবাজি রেখে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে যারা চিরদিনের জন্য দৃষ্টি হারিয়েছেন, পঙ্গুত্ববরণ করেছেন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন আমি তাদের সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং তাদের আশু রোগমুক্তি ও সুস্থ্যতা কামনা করছি। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থী, শিশু-কিশোর-যুবক, সম্মানিত শিক্ষক, পেশাজীবী, সাংবাদিক ও দিনমজুরসহ সকলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘শ্রদ্ধা জানাচ্ছি সেই সমস্ত রত্নগর্ভা মায়েদের, যারা নিজের সন্তানদের আন্দোলনে অংশগ্রহণে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি তাদের প্রতি, যারা দেশের অভ্যন্তরে ও দেশের বাইরে থেকে এ আন্দোলনকে বেগবান করতে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা কিংবা সমর্থন যুগিয়েছেন। আজ শ্রদ্ধা জানাচ্ছি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে, যিনি প্রবাসে থেকেও আন্দোলনকে গতিশীল করতে ছাত্র-জনতাকে সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা ও বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। সর্বোপরি, গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী হাবিপ্রবির প্রিয় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতিও সম্মান ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’
ভিসি অধ্যাপক এনামউল্যা বলেন, ‘৩৬ দিনের নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার এই চলমান আন্দোলনে শাসকগোষ্ঠী যে নির্মম বর্বরতা চালিয়েছিল, তা মানবতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে শাসকগোষ্ঠী এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে, তাদের হত্যাযজ্ঞ থেকে ঘরের শিশুও রক্ষা পায়নি। এমনকি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হত্যা করে লাশ আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। কিন্ত, শাসকগোষ্ঠী শত নির্যাতন, নির্মমতা ও নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের পরেও ছাত্র-জনতাকে তাদের ন্যায্য অধিকারের দাবি থেকে এক চুলও সরাতে পারেনি। বরং তারা অসীম সাহস, দৃঢ় মনোবল ও জীবন বাজি রেখে ফ্যাসিস্টদের মসনদ ধুলোয় মিশিয়ে দেয় এবং স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ও তার দোসররা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পরিশেষে, সন্তান হারানো মায়ের অশ্রু আর শত শত সন্তানের বুকের রক্ত স্রোত একাকার হয়ে ’২৪-এর ৫ আগস্ট পতন হয় ইতিহাসের ঘৃণিত স্বৈরশাসকের এবং আমরা অর্জন করি ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন বাংলাদেশ।’
‘জুলাই গণঅভ্যূত্থান’ দিবসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে ভিসি তার বাণীতে বলেন, ‘বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান আজ বিশ্বব্যাপী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মজলুম জনতার প্রতিবাদের একটি রোল মডেল হিসেবে সমাদৃত হয়েছে। ৩৬ জুলাই একদিকে আমাদের সন্তান হারানোর শোক ও বেদনার, অন্যদিকে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার গৌরবময় ঐতিহাসিক দিন। তাই, আমাদের অবশ্যই ’২৪-এর জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগের চেতনা ও মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে গণতন্ত্র ও দেশবিরোধী অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানাবিধ গভীর ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সবার আগে বাংলাদেশ। অতএব, বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মেধা ও যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে সর্বত্র ন্যয্যতা, সমতা ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক, আত্মমর্যাদাশীল, সুখী-সমৃদ্ধ ও স্বর্নিভর বাংলাদেশ গড়ার জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম মেধার মূল্যায়ন ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন দমনে নির্মম ও নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সকলের প্রতি আমার একান্ত আহ্বান— আসুন উচ্চশিক্ষার এ বিদ্যাপীঠকে সুনামের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করি এবং আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের পবিত্র স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট থাকি।’
কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল ১০:২৫ মিনিটে টিএসসি প্রাঙ্গণে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’-এর ওপর শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। পরে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন ভাইস-চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ড. মো: এনামউল্যা।
বাদ জোহর হাবিপ্রবি কেন্দ্রীয় মসজিদে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদের রূহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।


