বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, গণভোটের রায়ের বিষয়ে আপস করার জন্য আমাদেরকে প্রতিনিয়ত চাপ দেয়া হচ্ছে। আমাদেরকে লোভ দেখানো হচ্ছে। আমরা জনগণকে সাক্ষী রেখে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, আমরা আপনাদের গণভোটের গণরায়ের পাহারাদারি করব ইনশাআল্লাহ।
বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ১১ দলীয় ঐক্যের গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি আমরা পরিত্যাগ করব না, কোনো কিছুর বিনিময়েও না। জীবনের বিনিময়ে হলেও এ দাবি আদায় হবে ইনশাআল্লাহ। এ দাবি মহান আল্লাহর সাহায্য নিয়ে আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা আদায় করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।
তিনি সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, গণভোটের গণরায় মেনে নিন। ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে অপমান করবেন না। গণরায়কে অপমান করে বাঁচার পথ খুঁজে পাবেন না। জনগণের রায়কে যারাই অপমান করেছে, তাদেরকেই অপমানজনকভাবে পালাতে হয়েছে।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত যারা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন, আয়না ঘরের সাথী হয়েছেন, জেলে গিয়েছেন, মামলা খেয়েছেন, দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন, আমি তাদের সবাইকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে যে আন্দোলন দানা বেঁধেছিল, আকুণ্ঠ চিত্তে আমিও স্বীকার করতে চাই এ আন্দোলন কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি, এ আন্দোলন গড়ে ওঠেছিল ছাত্র-তরুণদের নেতৃত্বে। আমি তাদেরকে স্যালিউট জানাই।
জামায়াত আমির বলেন, সাড়ে ১৫ বছর দফায় দফায় আন্দোলন করেছি, জীবন দিয়েছি, জেলে গিয়েছি, ফাঁসির কাষ্ঠে দাঁড়িয়েছি, কিন্তু ফ্যাসিবাদকে আমরা তাড়াতে পারিনি। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে যখন সারাদেশ এক হয়ে গেল, তখন ফ্যাসিবাদ দুপুরের খাবার ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর আগেতো পালিয়ে যায়নি, এ বিজয়ের কৃতিত্ব জনগণের এবং নেতৃত্বের কৃতিত্ব তরুণ সমাজের।
তিনি বলেন, এ আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে কেউ টানাটানি করুক তা আমরা পছন্দ করি না। এ আন্দোলনের কোনো একক মাস্টারমাইন্ডকে আমরা স্বীকার করি না। এ আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড ১৮ কোটি নির্যাতিত জনগণ। এ আন্দোলনে অনেকেই কৃতিত্ব দাবি করছেন। কখনো মাস্টারমাইন্ড, কখনো আবার জুলাই শহীদদেরকে ভাগ-বাটোয়ারা করছেন। আমি এগুলোর নিন্দা জানাই।
ডা: শফিক বলেন, শহীদদেরকে রাজনৈতিক রং দেয়ার চেষ্টা করবেন না। যদি রাজনৈতিক দলের ডাকে সাড়া দেয়ার হতো, তা হলে তারা আগেই দিত। তারা আগে সাড়া দেয়নি। জীবন দেয়ার জন্য রাস্তায় নেমেছিল তরুণদের ডাকে। তারা জাতির সম্পদ। তারা কোনো দলের সম্পদ হতে পারে না। তাদের নিয়ে কোনো রাজনীতি হোক এটা আমি পছন্দ করি না।
ডা: শফিক বলেন, আহত পঙ্গু হয়ে যারা এখনো কাতরাচ্ছে, শরীরে অসংখ্য বুলেট-পিলেট নিয়ে। রাতে একটু ঘুমাতে পারেন না। স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারেন না। চলাফেরা করতে পারেন না। এখনো মেটালিক কেডস দিয়ে তাদেরকে হাঁটতে হয়। এখনো ব্যাংকক হাসপাতালে বিছানায় পড়ে আছে। এখনো পঙ্গু যোদ্ধারা ঘরে ঘরে কাতরাচ্ছে। তাদের দিকে নজর দেয়ার ফুরসত এ সরকারের হচ্ছে না। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, যাদের কারণে জাতি নাজাত পেয়েছে, তাদেরকে অবশ্যই সম্মান দিতে হবে।
তিনি বলেন, যারা জীবন দিয়েছে তাদেরকে রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত করতে হবে। শহীদ পরিবারগুলোকে সম্মানের সাথে পুনর্বাসন করতে হবে। যারা আহত-পঙ্গু হয়েছে, তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। সেটা দেশে হোক কিংবা বিদেশে হোক। এটা হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাদেরকেও সম্মানজনক পুনর্বাসন করতে হবে।
জামায়াত আমির বলেন, খুনিদেরকে, ফ্যাসিস্টদেরকে বিচারের আওতায় এনে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। লক্ষণ ভালো না, একটাও দেখতে পারছি না। সব যেন চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে। কার সাথে আঁতাত করে জাতির এ দাবিগুলো উপেক্ষা করা হচ্ছে আমরা জানতে চাই। এর জবাব প্রধানমন্ত্রীকে দিতে হবে। কারণ নির্বাচনের আগে তিনিও এ দাবিগুলো করেছিলেন। এখন কেন সেই দাবিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে?
তিনি বলেন, এখানে মজিবুর রহমান মঞ্জু ভাই বলে গেছেন, একই দিন দুই জমজ ভাইয়ের জম্ম হয়েছিল। একই চেহারার, দুই মিনিট আগে পরে সিল পড়েছে। এখন মা একজনকে সন্তান হিসেবে ধারণ করে, আরেকজনকে অস্বীকার করে, এমন কোনো মাকে দুনিয়ায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাহলে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন তারা এমন আচরণ করছেন কেন? এটা জাতির সাথে সুস্পষ্টভাবে প্রতারণা।
তিনি বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেন, তারা সংসদে দাঁড়িয়ে জাতির কাছে এটা স্বীকার করেন নিয়েছেন। স্বীকার করে নেয়ার জন্য ধন্যবাদ। মনে রাখবেন, এ স্বীকারোক্তির মাধ্যমে আপনারা জাতির সামনে প্রতারক হিসেবে নিজেদের নাম রেজিস্ট্রেশন করে নিয়েছেন। আপনারা প্রতারক। এ জন্য এ সরকারের অনেককে দেখলে জুলাই যোদ্ধারা ‘ভুয়া, ভুয়া’ বলে আওয়াজ তোলে। এটা জাতির জন্য লজ্জার।
ডা: শফিক বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলে আপনারাও মজলুম ছিলেন। ফ্যাসিবাদীরা যেসব জুলুম করেছে, অপকর্ম করেছে, আপনারা এ পাঁচ মাসে সবগুলোর রেপলিকা-ফটোকপি আমাদেরকে দেখিয়েছেন। ফ্যাসিবাদী আচরণ করবেন, আর জনগণ ফ্যাসিবাদী বললে আপনার রাগ করবেন, এটা বেমানান।
তিনি আরো বলেন, ফ্যাসিবাদী আচরণ ছেড়ে দেন, জনগণ ফুলের মালা দিয়ে আপনাদের বরণ করবে। দেশ গড়ার কাজে সহযোগিতা করবে। আমাদের সবার দেশকে আমরা ভালোবাসি। কিন্তু আল্লাহর কসম করে বলছি, বাংলার জমিনে কোনো ফ্যাসিবাদকে আমরা সহ্য করব না।
শিক্ষাঙ্গণে ছাত্রদলের হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, গত কয়েকদিনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যা হচ্ছে, তাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আতঙ্কগ্রস্ত। সেই গণরুম, সেই গেস্ট রুম, সেই ফ্যাসিবাদ, নতুন অ্যাপ্রন গায়ে ফিরে আসছে কিনা। আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাইকে বলব, ফ্যাসিস্ট যেখানে, প্রতিরোধ সেখানে। ছাড় দেয়া হবে না, ছাড় আপনারা দেবেন না।
তিনি বলেন, পাপ বালিগ হতে সময় লাগে। কিন্তু বালিগ হওয়ার পর ওই গাছের বৃন্ত থেকে ওটা পচে গিয়ে পড়ে যায়। পাপে পাপে পচন ধরেছে, এখন সরকার যদি এটা বুঝতে পারে তাহলে ভালো। না বুঝতে পারলে পতন কেউ ঠেকাতে পারবে না।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, উনারা বলতে চান, মাত্র পাঁচ মাস হলো সরকারের এত অস্থির কেন আপনারা? আমি পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই, মাত্র পাঁচ মাসের ভেতর আপনারা জনগণের সাথে এত বিশ্বাসঘাতকতা করলেন কেন আপনারা? আপনারা যদি বিশ্বাসঘাতকতা না করতেন, আমাদের তো অস্থিরতার কোনো কারণ ছিল না। দেশের বারোটা বাজবে আর আমরা বসে বসে আঙুল চুষব, এটা হবে না।
তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা প্রস্তুত হোন, সব দেখে মনে হচ্ছে আরেকটা অনিবার্য বিপ্লব আসন্ন। এ বিপ্লবের জন্য আমি আপনাদের সবাইকে প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। এখানে আমরা যারা বসে আছি, অনেকে বয়স্ক আবার অনেকে তরুণ। বিপ্লব কিন্তু কোনো বয়স মানে না। যেমন চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, ১০ মাসের শিশু থেকে ৯০ বছরের বৃদ্ধ সবাই রাজপথে ছিল।
জামায়াত আমি বলেন, আগামীতেও বয়স বিপ্লবকে সঙ্গ দিয়েই সামনে এগিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। সেই দিন সবাই হবে তরুণ, সবাই হবে যুবক। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সবাই হবে আপসহীন। বিজয় ছিনিয়ে আনার তীব্র লড়াই হবে ইনশাআল্লাহ।
তিনি সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, জেল জুলুমের ভয় দেখাবেন না। আল্লাহর রহমতে আমরা এগুলোকে পাত্তাই দিই না। ফাঁসির ভয় দেখাবেন না। ফাঁসির রশি যদি জাতির মুক্তির জন্য প্রয়োজন হয়, ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেব। ফাঁসির তক্তার উপর দাঁড়িয়ে বুক কাঁপবে না, ঠোঁট কাঁপবে না। বিজয়ের জয়ধ্বনি শুনিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।


