ওয়েবিনারে বক্তারা

মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন শাহ্ আবদুল হান্নান

ওয়েবিনারে বক্তারা শাহ্ আবদুল হান্নানের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন, ইসলামী চিন্তাচর্চা, শিক্ষা, গবেষণা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং সমাজ উন্নয়নে তার অসামান্য অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। এতে শাহ্ আবদুল হান্নানের জীবন ও কর্মের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
শাহ্ আবদুল হান্নান
শাহ্ আবদুল হান্নান |সংগৃহীত

মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন শাহ্ আবদুল হান্নান। তার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মাটি-মানুষের একজন গর্বিত সন্তান। এমন বিনয়ী ও গুণী মানুষ সমাজে বিরল। তিনি ছিলেন সততা ও আদর্শের মূর্ত প্রতীক।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট (বিআইআইটি) কর্তৃক মরহুম শাহ্ আবদুল হান্নানের ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ওয়েবিনারে একুশে পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বৌদ্ধ অধ্যায়ন বিভাগের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া এসব কথা বলেন।

বিআইআইটি’র মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এম আবদুল আজিজ এর উপস্থিতিতে ওয়েবিনারে স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য প্রদান করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর সাবেক চেয়ারম্যান ও অর্থমন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিআইআইটি’র ভাইস-প্রেসিডেন্ট ড. আনিসুজ্জামান, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আবদুর রব, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) সাবেক ভারপ্রাপ্ত ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আবু বকর রফিক, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের অর্থনীতি ও অর্থায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কবির হাসান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এস. এম. মাহবুব-উল-আলম, ইউনাইডেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক, বিআইআইটি ট্রাস্টের ভাইস-প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. আবু খলদুন আল মাহমুদ, মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ার (আইআইইউএম) ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হাসান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি স্টাডিজ বিভাগের ড. মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ এবং ‘দ্য পাইওনিয়ার’-এর সভাপতি হাবিবুর রহমান।

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া বলেন, তিনি দল-মত-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার কল্যাণেই নিবেদিত ছিলেন। তার সংস্পর্শে যে এসেছে সেই আলোকিত হয়েছে। তিনি একজন ভালো গবেষকও ছিলেন। তার লেখায় মৌলিকত্ব ছিল। তিনি ছিলেন একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। সময় এসেছে তার শিক্ষাকে আমাদের নিজেদের জীবনে ধারণ করা এবং প্রচার করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আজীবন তিনি যুদ্ধ করেছেন। তিনি সদা পার্থিব লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকেছেন।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, শাহ আবদুল হান্নানের কাছে কোনো সমস্যা নিয়ে গেলে তিনি সমাধান দিয়ে দিতেন। তিনি অনেকের মেন্টর ছিলেন। জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান চর্চা এবং সেই জ্ঞানের প্রতিফলন ব্যবহারিক জীবনে ঘটিয়েছেন। তিনি যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করে বুঝাতেন। তিনি একজন চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন।

Webinar

অধ্যাপক ড. কবির হাসান বলেন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি তার কর্ম, চিন্তা ও সততার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তিনি যেমন বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তেমনি জাতীয় রাজস্ব ব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। একজন শিক্ষক, গবেষক ও লেখক হিসেবে তিনি ইসলামী অর্থনীতি, আইন এবং সামাজিক বিজ্ঞানের পুনর্গঠনের প্রশ্নে নতুন চিন্তার দ্বার উন্মোচন করেন। তার প্রজ্ঞা, নৈতিক দৃঢ়তা, মানবিকতা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। বক্তা তার কর্মময় জীবন ও অবদানকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং জাতীয় উন্নয়ন ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান।

তিনি আরো বলেন, শাহ্ আবদুল হান্নান অত্যন্ত জ্ঞানপিপাসু মানুষ ছিলেন। তার দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। সকলকেই তিনি সময় ও সম্মান দিতেন। কাউকে কখনোই ছোটো করে দেখতেন না। মানুষের সাথে মিশে কাজ করার প্রবণতাটা তার মধ্যে দারুণভাবে ছিল। তার অনুপ্রেরণাই অনেককে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। তিনি পাইওনিয়র ও উইটনেস সংগঠন তৈরির মাধ্যমে অনেক যুবক-যুবতীদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে অনুপ্রাণিত করেছেন। আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল থিংক ট্যাংকগুলো আরও বাড়ানো দরকার, আরও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বানানো দরকার, বিভিন্ন ধরনের জ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ নেয়া দরকার।

বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এস. এম. মাহবুব-উল-আলম বলেন, তিনি সরল জীবনযাপন করতেন। যার চিন্তা, আদর্শ ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করবে এবং দেশ ও সমাজ গঠনে পথনির্দেশনা দেবে। উম্মাহর জন্য, দেশের জন্য ও জাতির জন্য ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। বাংলাদেশে ইসলাম চর্চাকে আধুনিক রূপে নিতে তিনি ছিলেন অগ্রগামী ব্যক্তিত্ব। তিনি একই সাথে অনেকগুলো ক্ষেত্রে সফলভাবে বিচরণ করেছেন। তিনি সবার অধিকার সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি যে বেতন বৈষম্য পছন্দ করতেন না, তার প্রমাণ তারই প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বেতন কাঠামো।

ওয়েবিনারে বক্তারা শাহ্ আবদুল হান্নানের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন, ইসলামী চিন্তাচর্চা, শিক্ষা, গবেষণা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং সমাজ উন্নয়নে তার অসামান্য অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। এতে শাহ্ আবদুল হান্নানের জীবন ও কর্মের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।

বিআইআইটি’র উপপরিচালক ড. সাইয়েদ শহীদ আহমেদের তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হওয়া অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক সেলিন ইয়াসমিন। শেষে দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন বিআইআইটি’র ফেলো ড. ইবরাহীম খলিল আনওয়ারী।