বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে দেশের সম্ভাব্য প্রতিটি নাগরিককে সামাজিক সুরক্ষা বলয় ও অর্থনৈতিক সহায়তা কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, প্রান্তিক কৃষক, স্বল্প আয়ের পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি ভর্তুকি, কৃষি উপকরণ, আর্থিক সহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সাথে দেশের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে সরকারের সহায়তা নেটওয়ার্ক ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।
আজ সোমবার ‘ন্যাভিগেটিং ফাইভ-ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর অ্যাচিভিং এসডিজিস: পলিসি, পার্টনারশিপ অ্যান্ড প্রায়োরিটিজ’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সরকারপ্রধান বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) বাস্তবায়নে সাফল্য দেখিয়েছে, একইভাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নেও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করে চলেছে।
এসডিজির ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ নীতির সাথে বর্তমান সরকারের জননীতিরও সামঞ্জস্য রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ নিশ্চিত করাই সরকারের নীতি। এ ক্ষেত্রে সরকারের মূলনীতি হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
বিএনপির জননীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণকে কেন্দ্র করেই দলটির সব পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণীত হয়েছে। তার ভাষ্যে, ‘সব সময়ই বিএনপির সকল পরিকল্পনা এবং কর্মসূচি ছিল জনবান্ধব। যেমন দেশ এবং জনগণের উন্নয়নে আমরা এখানে উপস্থাপিত একটি ডকুমেন্টারিতেও দেখেছি- স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং বর্তমান রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা ঐতিহাসিকভাবেই প্রতিটি ভিশন এবং মিশনের সাথে এমডিজি কিংবা বর্তমানে এসডিজির খুব বেশি অমিল নেই।’
তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শোষণ-শাসনে বাংলাদেশ একটি ঋণ ও আমদানিনির্ভর ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। এখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশসহ সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করতে হবে। এই পুনর্গঠনের যাত্রায় এসডিজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
জনগণের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, এই কাঠামোর মাধ্যমে দেশের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাকে জাতিসঙ্ঘ-ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির সাথে সমন্বয় করা হয়েছে।
সরকারের সংস্কার ও উন্নয়নের পাঁচ স্তম্ভের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, লিঙ্গ সমতা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং সুশাসনের মতো এসডিজির মূল অগ্রাধিকারগুলো প্রতিফলিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ এবং এসডিজি বাস্তবায়নে অর্জিত অগ্রগতিকে সুসংহত করতে সরকার পুনরুদ্ধার, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন (থ্রি আর)- এই তিন ধাপের কৌশল গ্রহণ করেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘থ্রি আর’ কৌশলের মাধ্যমে সাময়িক স্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত রূপান্তর পর্যন্ত সব কার্যক্রম একটি সুসংহত পথনকশার আওতায় বাস্তবায়ন করা হবে।
জনগণের ভোটে সরকার গঠনের পর থেকেই নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, কৃষকের স্বার্থ রক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা সহজ করতে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ চলছে বলে জানান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় ‘কৃষক কার্ড’ এবং জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা সহজ করতে ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এসব কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক, স্বল্প আয়ের পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি ভর্তুকি, কৃষি উপকরণ, আর্থিক সহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি ‘স্পোর্টস কার্ড’ চালু এবং সারাদেশের ইমাম-মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী ভাতার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কর্মসূচির বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
‘অর্থাৎ কোনো না কোনো উপায়ে দেশের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে সরকারের সহায়তা নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছে ধীরে ধীরে। এভাবে চলতি মেয়াদের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে সম্ভাব্য প্রতিটি নাগরিককে সামাজিক সুরক্ষা বলয় এবং অর্থনৈতিক সহায়তা কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের সুচিন্তিত পথনকশা সরকারের রয়েছে।’
‘এসডিজি ভিলেজ’ কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের তিনটি জেলার তিনটি উপজেলায় তিনটি গ্রামকে এসডিজি স্থায়ীকরণের পাইলট মডেল হিসেবে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়েছে। গ্রামগুলো হলো রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিংগাছড়ি, খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর।
এসব গ্রামে ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণ, স্কুল ড্রেস, মাদরাসাভিত্তিক শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রাম পর্যটন, ‘ব্লু এমপ্লয়মেন্ট’, ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন ও ‘ইকোট্যুরিজম’সহ বিভিন্ন কর্মসূচি একযোগে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। পাশাপাশি এসব কর্মসূচির প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হবে। এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য গ্রামেও এ মডেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
‘এসডিজি ভিলেজ’ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি উন্নয়ন মডেল হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার দৃষ্টান্তমূলক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এসডিজি বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও নাগরিকদের সম্মিলিত সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কোনো একক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সহযোগিতা।’
তিন দিনের এই সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনায় সরকারের তিনটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রথমত, সরকার এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়, যেখানে অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা থাকবে। দ্বিতীয়ত, এমন একটি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকার সর্বজনীন হবে। তৃতীয়ত, এমন একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলা হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক সুযোগ ও আন্তঃপ্রজন্মীয় ন্যায্যতা নিশ্চিত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক, গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট এবং বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগকে সম্মেলন আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানান।
২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সবাইকে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সম্মেলনের সাফল্য কামনা করেন। একই সাথে তিনি ‘এসডিজি ভিলেজ’ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
সূত্র : ইউএনবি


