নিয়োগ বাণিজ্য ও অসদাচরণ

ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর মুহিউদ্দীন বরখাস্ত

নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে হত্যা মামলার আসামি

মুহিউদ্দীনের বিরুদ্ধে অবৈধ নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। একইসাথে ২০২২ সালে বগুড়ার শিবগঞ্জে তার মা দুলালী বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায়ও তাকে আসামি করা হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
মুহিউদ্দীন
মুহিউদ্দীন |নয়া দিগন্ত

নিয়োগ বাণিজ্য, অসদাচারণসহ নানা অভিযোগে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর মুহিউদ্দীনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে অবৈধ নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। একইসাথে ২০২২ সালে বগুড়ার শিবগঞ্জে তার মা দুলালী বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায়ও তাকে আসামি করা হয়েছে।

অসদাচরণের অভিযোগে চলতি বছরের ২ জুলাই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর।

সরকারি নথি অনুযায়ী, গত ১ জুলাই অধিদফতরের ব্যারাক ভবনের চতুর্থ তলার একটি অতিথি কক্ষে সিলেট বিভাগের ১৫টি ফায়ার স্টেশনের পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছিল। এ সময় এক নারী ও সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়া চালক সাখাওয়াত হোসেনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। সরকারি আদেশে বলা হয়েছে, ওই ঘটনায় মুহিউদ্দীনও জড়িয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে সেখানে মারামারির ঘটনা ঘটে।

এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, ১ জুলাইয়ের ওই ঘটনার সাথে মুহিউদ্দীনের জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নজরে আসার পরপরই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

মহাপরিচালক আরো বলেন, মুহিউদ্দীনের বিরুদ্ধে উঠা অন্যান্য অভিযোগের তদন্তও বর্তমানে চলমান রয়েছে। তদন্তে আনীত অভিযোগ সত্য বলে প্রমাণিত হলে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দুদকে অভিযোগ

২০২৬ সালের ১১ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের করা অভিযোগপত্রে মহিউদ্দীনের বিরুদ্ধে নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হাবিবুর রহমানের স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মুহিউদ্দীন নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতেন।

অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কয়েক হাজার ফায়ার ফাইটার ও চালক নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে এই মুহিউদ্দিনের হাত ধরে। বিশেষ করে বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ফায়ার ফাইটার ও চালক নিয়োগের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে সেসময়ে সর্বমোট তিন হাজার ৫০০ জন নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে মুহিউদ্দীন অন্যতম পরিকল্পনাকারী বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। একই সময়ে ফায়ার সার্ভিসের বদলি শাখায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলিকে কেন্দ্র করেও আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র ছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর দেয়া একটি অভিযোগপত্রে মুহিউদ্দীন ও তার কথিত সিন্ডিকেটের বিষয়ে একই অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

মুহিউদ্দীনের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী হয়েও অল্প সময়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগপত্রে ঢাকার উত্তরায় প্রায় তিন কাঠা জমি, কয়েকটি ট্রাক এবং বিভিন্ন এলাকায় জমি কেনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা

এদিকে, ২০২২ সালে বগুড়ার শিবগঞ্জে দুলালী বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় মুহিউদ্দীনকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। ২০২২ সালের ২৪ মার্চ ওই বিরোধের জের ধরে দুলালী বেগমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। মামলার নথিতে আরো বলা হয়েছে, দিবাগত রাত ১টার দিকে দুলালী বেগমের ছোট ছেলে মমিন খন্দকার মায়ের মৃত্যুর খবর পান। ঘটনাস্থলে গিয়ে মৃত্যু অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করা হয়েছিল বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় লাশ উত্তোলন, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের আবেদনও করা হয়।

মুহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে, রংপুরের এক ড্রাইভারের পারিবারিক কলহের কারণে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তিনি অনৈতিক সুবিধা নিতে লিপ্ত রয়েছেন।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেন মুহিউদ্দিন। সাবেক পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হাবিবুর রহমানের স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি গড়ে তোলেন বিশাল নিয়োগ সিন্ডিকেট। সর্বশেষ আওয়ামী সরকারের সাবেক রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার পদে নিযুক্ত ছিলেন হাবিবুর রহমান। এই সুবাদে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার ফায়ার ফাইটার ও ড্রাইভার নিয়োগে কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের হোতা ছিলেন মুহিউদ্দিন।