গুমবিরোধী খসড়া আইন দায়মুক্তির সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখবে : এনসিপি

এনসিপির ভাষ্য, স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে প্রস্তাবিত আইন গুমের ঘটনায় দায়মুক্তির অবসান না ঘটিয়ে বরং দায়মুক্তি ও অস্বীকারের সংস্কৃতিকেই টিকিয়ে রাখবে।

এনসিপি
এনসিপি |সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার খসড়া আইন, ২০২৬-কে গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন সংস্থা নিয়োগের দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির অভিযোগ, প্রস্তাবিত আইনে যেসব বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠতে পারে, তাদেরই নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থার মাধ্যমে তদন্তের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে স্বার্থের সঙ্ঘাত তৈরি হয়ে গুমের ঘটনায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানায় এনসিপি। বিবৃতিটি পাঠান দলটির দফতর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার খসড়া আইন, ২০২৬’ অনুমোদন করেছে। গুম সংক্রান্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশটি বর্তমান সরকার এপ্রিলে বিলুপ্ত করায় নতুন করে সংঘটিত গুমের ক্ষেত্রে দেশে বর্তমানে কোনো আইনি সংজ্ঞা নেই। তাই গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য নতুন আইন প্রয়োজন হলেও সরকার অধিকতর কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে দুর্বল আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ দলটির।

এনসিপির মতে, খসড়া আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তদন্তব্যবস্থায়। খসড়ার ১৪ ধারা অনুযায়ী, গুমের অভিযোগ করতে হলে থানায় যেতে হবে এবং তদন্ত করবে পুলিশ। অথচ একই আইনে পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থার সদস্যদের গুমে জড়িত থাকার সম্ভাবনা স্বীকার করা হয়েছে। ফলে অভিযুক্ত বাহিনীর আওতাধীন ব্যবস্থায় তদন্ত হলে তা স্বাধীন হতে পারে না বলে দাবি করেছে এনসিপি।

দলটি আরো বলেছে, বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ নথিভুক্ত না করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন দেড় হাজারের বেশি অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে ২৫০টিরও কম ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করা সম্ভব হয়েছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগ গ্রহণে অস্বীকৃতির কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।

খসড়া আইনে পুলিশ অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানালে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যাওয়ার সুযোগ রাখা হলেও এনসিপির মতে, এতে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ অভিযোগ নথিভুক্ত হওয়ার পর তদন্ত আবার পুলিশের কাছেই ফিরে যাবে।

খসড়া আইনের ২১ ধারায় মিথ্যা ও হয়রানিমূলক অভিযোগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে দলটি। এনসিপির বক্তব্য, তদন্ত স্বাধীন না হলে এ বিধান প্রকৃত ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে গুমের অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

বাংলাদেশ ২০২৪ সালের আগস্টে ‘গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে’ যোগ দিয়েছে উল্লেখ করে এনসিপি বলেছে, সনদের ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গুমের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে তদন্ত করানো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সাংঘর্ষিক বলেও দাবি দলটির।

এনসিপি খসড়া আইনের ১৪ ধারা সংশোধন করে পুলিশ, সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের বাইরে একটি স্বাধীন সংস্থাকে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেয়ার দাবি জানিয়েছে। আগের অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রশিক্ষিত তদন্ত ইউনিটকে দেয়া দায়িত্ব পুনর্বহাল অথবা প্রয়োজনীয় আইনগত ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনেরও দাবি জানিয়েছে দলটি।

এনসিপির ভাষ্য, স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে প্রস্তাবিত আইন গুমের ঘটনায় দায়মুক্তির অবসান না ঘটিয়ে বরং দায়মুক্তি ও অস্বীকারের সংস্কৃতিকেই টিকিয়ে রাখবে।