মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ও মার্জিন রুলস বাতিলের আশ্বাস বিএসইসি চেয়ারম্যানের

‘বিগত কমিশনের বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুইটি বিতর্কিত কালো আইন মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০২৫ ও মার্জিন রুলস ২০২৫। পুঁজিবাজারের স্বার্থে এই আইন দু’টি বাতিল করা জরুরি।’

নয়া দিগন্ত অনলাইন
আলোচনা সভায় বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি
আলোচনা সভায় বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি |নয়া দিগন্ত

সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে বিএসইসি চেয়ারম্যান দুইটি বিতর্কিত কালো আইন মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০২৫ ও মার্জিন রুলস ২০২৫ দুই মাসের মধ্যে বাতিলের আশ্বাস দিয়েছেন।

বুধবার (১০ জুন) রাজধানীর বিজয়নগরে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের (সিএমজেএফ) কার্যালয়ে বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এক সেমিনারে বিষয়টি জানান সংগঠনের সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন।

সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগকারী ফোরামের সভাপতি জহুরুল হক জুয়েল। এছাড়া বিভিন্ন বিনিয়োগকারী সংগঠনের প্রতিনিধি, বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীরা উপস্থিত ছিলেন।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, বিগত কমিশনের বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুইটি বিতর্কিত কালো আইন মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০২৫ ও মার্জিন রুলস ২০২৫। পুঁজিবাজারের স্বার্থে এই আইন দু’টি বাতিল করা জরুরি।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) প্রণীত ‘মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫ এবং মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড রূপান্তর বা অবসায়নসংক্রান্ত সাম্প্রতিক নির্দেশনা পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাদের দাবি, বর্তমানে দেশের ক্লোজড-অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর অধীনে প্রায় ৭০০০ কোটি টাকার তালিকাভুক্ত শেয়ার বিনিয়োগ রয়েছে, যা বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। মেয়াদি (ক্লোজড-এন্ড) মিউচুয়াল ফান্ডকে রূপান্তর বা অবসায়নের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হলে দেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিনিয়োগকারী নেতারা। তাদের মতে, এতে শুধু মিউচুয়াল ফান্ড খাতই নয়, সামগ্রিক পুঁজিবাজারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

বক্তাদের মতে, এসব ফান্ডের সম্পদ বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হলে বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে কয়েক হাজার কোটি টাকার শেয়ার বিক্রির চাপ সৃষ্টি হবে। এতে বাজারের সূচক উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেই আতঙ্ক থেকে অতিরিক্ত বিক্রির প্রবণতা তৈরি হলে বাজারে মোট বিক্রির চাপ ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

সেমিনারে কয়েকজন বিনিয়োগকারী বলেন, ক্লোজড-অ্যান্ড ফান্ডগুলো দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীল প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করছে। তাদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে বিভিন্ন তদন্ত ও পরিদর্শনের মাধ্যমে ফান্ড পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অযথা চাপের মধ্যে রাখা হয়েছে। তারা প্রশ্ন তোলেন, বাজারের স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখা ফান্ডগুলোকে কেন রূপান্তর বা অবসায়নের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।

বক্তারা আরো বলেন, ওপেন-অ্যান্ড ফান্ডে রূপান্তর করলেও সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ ওপেন-অ্যান্ড ফান্ডে ইউনিটধারীরা অর্থ ফেরত চাইলে ফান্ডকে সম্পদ বিক্রি করেই সেই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। যার ফলে বাজার থেকে অর্থ বেরিয়ে যাবে এবং বাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়বে।

কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ

সেমিনারে বলা হয়, দেশের ৬৭টি সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন মিউচুয়াল ফান্ড কার্যক্রমের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত রয়েছেন। মেয়াদি ফান্ডগুলোর বাধ্যতামূলক অবসায়ন বা রূপান্তরের ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান সঙ্কট দেখা দিতে পারে।

কয়েকজন অংশগ্রহণকারী জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তাদের মতে, ক্লোজড-অ্যান্ড ফান্ড খাত সঙ্কুচিত হলে এ ধরনের বেকারত্ব আরো বাড়বে এবং পুঁজিবাজারনির্ভর বহু পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।

অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ১২৭ জন কর্মকর্তার অপসারণ দাবি

আলোচনা সভায় বিএসইসিতে শিবলী রুবাইয়াত এর সময়কালে অবৈধ ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ১২৭ জন কর্মকর্তার দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সংগঠনটির সভাপতি বলেন এই নিয়োগের মাধ্যমে কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা মার্জিন রুলস আইন এবং মিউচ্যুয়াল ফান্ড আইন ২০২৫ বাস্তবায়নের কলকাঠি নাড়ছে এবং পুঁজিবাজার ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে।

বিএসইসির সদ্য যোগদানকারী চেয়ারম্যান মাসুদ খান দেশের বাইরে থাকা সত্ত্বেও এসব অসাধু কর্মকর্তারা কালো আইন বাস্তবায়নের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে বিগত ৯ জুন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ফান্ডের ট্রাস্টি হিসেবে আইসিবিকে চিঠি প্রেরণ করে পুঁজিবাজারে বিদ্যমান মেয়াদী মিউচ্যুয়াল ফান্ড সমূহকে ২০২৫ সালের কালো আইনের মাধ্যমে অবসায়ন বা রূপান্তর প্রক্রিয়া পরিচালনা করার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে।

পুনর্বিবেচনার আহ্বান

সেমিনার থেকে বক্তারা মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড অবসায়ন বা রূপান্তরসংক্রান্ত নির্দেশনা পুনর্বিবেচনা, স্থগিত অথবা বাতিলের আহ্বান জানান। তাদের মতে, বিনিয়োগকারী, সম্পদ ব্যবস্থাপক, ট্রাস্টি, কাস্টডিয়ান, বাজার বিশেষজ্ঞ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

তারা বলেন, দেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে আস্থা ও তারল্য সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় প্রায় তিন দশক ধরে গড়ে ওঠা মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়া হলে বিনিয়োগকারী আস্থা পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা আরো কঠিন হয়ে পড়বে। তাই বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।