অর্থমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জিং বাজেট পেশ আজ

‘নতুন অর্থবছরের বাজেটে একদিকে ব্যবসায়ী, সরকারি চাকরিজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হবে, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর কাঠামোতেও কিছু পরিবর্তন আনা হতে পারে।’

বিশেষ সংবাদদাতা
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী |ফাইল ছবি

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় চার মাসের মাথায় আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে তার জীবনের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। বেলা ৩টায় তিনি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করবেন। ব্যবসায়ী ও দীর্ঘদিনের রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত আমীর খসরু এর আগে বিএনপি সরকারের সময় বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এবার অর্থ ও পরিকল্পনা-দু’টি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একসাথে পালন করছেন তিনি। অতীতে মরহুম এম সাইফুর রহমানও একই সাথে এ দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, নতুন অর্থবছরের বাজেটে একদিকে ব্যবসায়ী, সরকারি চাকরিজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হবে, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর কাঠামোতেও কিছু পরিবর্তন আনা হতে পারে।

বিদেশী ঋণের ওপর নির্ভরশীল বাজেট

বাজেট ঘাটতি পূরণে চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেটে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল এক লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৬ শতাংশের সমপরিমাণ। তবে অর্থবছরের শেষ দিকে এসে প্রত্যাশিত ঋণপ্রাপ্তি না হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্য কমিয়ে ৯৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়।

এদিকে আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। অনুদান বাদে প্রস্তাবিত দুই লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতির বড় একটি অংশ এই ঋণের মাধ্যমে পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে। জিডিপির অনুপাতে এ ঋণের পরিমাণ হবে প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

বাজেট ঘাটতির আরেকটি বড় উৎস হিসেবে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে বাড়িয়ে এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়।

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির রূপরেখা

‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন, বিনিয়ন্ত্রণকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ডি-রেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং সৃজনশীল অর্থনীতির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা তুলে ধরবেন।

বাজেটে দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব থাকবে। বিএনপি সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কার্যক্রমের জন্যও বিশেষ বরাদ্দ রাখা হতে পারে।

পূর্ববর্তী সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা

বাজেট বক্তৃতায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও একটি পর্যালোচনা তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে। খসড়া বক্তৃতায় বলা হয়েছে, ২০০৬ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতা ছাড়ার সময় বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ৬৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১০ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়।

এছাড়া সুদ পরিশোধের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছিল ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়।

রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৭ লাখ কোটি টাকা

আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কর-বহির্ভূত রাজস্ব (এনবিআর) থেকে আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা।

৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি

আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির তুলনায় ৭০ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত এডিপির তুলনায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি।

এই উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা দেশীয় উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ৫ হাজার কোটি টাকা অনুদান পাওয়ার আশা করছে সরকার।

বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা

আয় ও ব্যয়ের প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।

প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬.৫ শতাংশ

সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

আগামী অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা, যা সংশোধিত হিসাবে ৬১ লাখ ২১ হাজার ৯১০ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর জন্য এটি শুধু প্রথম বাজেটই নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নব্যয় বাস্তবায়নের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে। দেশের ব্যবসায়ী মহল, বিনিয়োগকারী, সরকারি কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এখন আজকের বাজেট ঘোষণার দিকে।