‘সরকারকে বিপদে ফেলতে পিক সিজনে নতুন সার ডিলার নীতিমালা জারি’

সভায় বক্তারা বলেন, আগামী মার্চ পর্যন্ত সার ব্যবহারের পিক মৌসুম। এমন সময়ে নতুন ডিলার নিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলে সার সরবরাহে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। তাদের মতে, ১৯৯৫ সাল থেকে সরকারি চুক্তি ও শর্ত মেনে সার উত্তোলন ও বিতরণ করে আসছেন বিদ্যমান ডিলাররা। দীর্ঘদিনের এই বিতরণব্যবস্থা পরিবর্তনের আগে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও ডিলারদের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

নিজস্ব প্রতিবেদক
৬৪ জেলার সার ডিলার নেতাদের নিয়ে বিএফএর যৌথসভা
৬৪ জেলার সার ডিলার নেতাদের নিয়ে বিএফএর যৌথসভা |ছবি : নয়া দিগন্ত

সার বিতরণের পিক সিজন সামনে রেখে নতুন ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ নীতিমালা কার্যকর না করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)। সংগঠনটির জেলা পর্যায়ের নেতারা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে সার বিতরণ করে আসা ডিলারদের সাথে আলোচনা ছাড়া নতুন নীতিমালা চাপিয়ে দিলে মাঠপর্যায়ে সার বিতরণে জটিলতা তৈরি হবে। এতে কৃষক পর্যায়ে সময়মতো সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই গত ৯ আগস্ট জারি করা ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫ (সংশোধিত)’ বাতিল করে বিদ্যমান ডিলারদের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন তারা। একইসাথে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরে হস্তক্ষেপ কামনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) নেতারা।

বুধবার দুপুরে রাজধানীর আল রাজী সেন্টারে ৬৪ জেলার সার ডিলার নেতাদের নিয়ে বিএফএর যৌথসভায় এ দাবি ও সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সভায় সংগঠনের বিভিন্ন জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দেন।

সভায় বক্তারা বলেন, আগামী মার্চ পর্যন্ত সার ব্যবহারের পিক মৌসুম। এমন সময়ে নতুন ডিলার নিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলে সার সরবরাহে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। তাদের মতে, ১৯৯৫ সাল থেকে সরকারি চুক্তি ও শর্ত মেনে সার উত্তোলন ও বিতরণ করে আসছেন বিদ্যমান ডিলাররা। দীর্ঘদিনের এই বিতরণব্যবস্থা পরিবর্তনের আগে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও ডিলারদের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সার ডিলার নেতারা বলেন, নতুন নীতিমালায় ডিলার ইউনিট পুনর্বিন্যাস করে নতুন ডিলার নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা অনেক ডিলার একই এলাকায় নতুন ডিলারের সাথে প্রতিযোগিতায় পড়বেন। ফলে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। কোনো ডিলার অনিয়ম করলে সুনির্দিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পক্ষে তারা। কিন্তু কয়েকজনের অনিয়মের দায়ে সব ডিলারকে নতুন করে মূল্যায়নের আওতায় এনে পুরনো ব্যবস্থা ভেঙে দেয়া উচিত নয়।

বিএফএ চেয়ারম্যান মো: মোশারফ হোসেন বলেন, দেশে ফসল উৎপাদন ও সারের ব্যবহার বাড়ার কারণে প্রয়োজন হলে কিছু ডিলার বাড়ানো যেতে পারে। তবে আগে অনিয়মকারী ডিলারদের চিহ্নিত করতে হবে। তদন্ত করে তাদের ডিলারশিপ বাতিল করা যেতে পারে। কিন্তু ২৫-৩০ বছর আগে ২ লাখ টাকা জমা দিয়ে যারা ডিলারশিপ নিয়েছেন, তাদের বাদ দিয়ে একই জায়গায় নতুন ডিলার নিয়োগ করা হলে পুরনো ডিলারদের অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়বে।

তিনি বলেন, বর্তমানে একজন ডিলারের গড়ে ব্যবসার সময় মাত্র তিন মাস। পিক মৌসুমে একজন ডিলার ৪০ থেকে ৫০ টন পর্যন্ত সার পেলেও অন্য সময়ে দুই-চার বা পাঁচ বস্তার মতো সার পান। অথচ যে কমিশনে তারা দীর্ঘদিন আগে ব্যবসা শুরু করেছিলেন, সেই তুলনায় বর্তমানে সার পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় অনেক বেড়েছে। বিএডিসি, বিসিআইসি ও আমদানিকারকদের গুদাম থেকে ডিলারের গুদাম পর্যন্ত প্রতি ব্যাগ সার পৌঁছাতে প্রায় ৭০ টাকা খরচ হয়।

ডিলার কমিশন বাড়ানোর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে জানিয়ে মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকারকে কমিশন দ্বিগুণ করার বিষয়ে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা চলছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে বলে তারা আশা করছেন।

সভায় প্রতি ইউনিয়নে অন্তত একজন সার ডিলার রাখার দাবি জানানো হয়। তারা বলেন, কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছানোর জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত ডিলার থাকা জরুরি। নতুন ব্যবস্থায় ডিলার ইউনিট কমে গেলে প্রত্যন্ত এলাকার কৃষক সার পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন।

তবে সংশোধিত সরকারি নীতিমালায় ইউনিয়ন ও পৌরসভায় প্রতি তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে একটি ডিলার ইউনিট গঠন করে প্রতি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় সর্বোচ্চ তিনজন করে সার ডিলার রাখার বিধান করা হয়েছে। বর্তমানে নিয়োজিত বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারদের মধ্যে পুনর্বণ্টনের পর কোনো ডিলার ইউনিট শূন্য থাকলে সেখানে নতুন ডিলার নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। একজন ডিলারের অধীনে সর্বোচ্চ তিনটি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র রাখার বিধানও করা হয়েছে।

সরকারের সংশোধিত নীতিমালায় সার বিতরণব্যবস্থা সুশৃঙ্খল করা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং একক নীতিমালার আওতায় সার বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। একই পরিবারের একাধিক ডিলার নিয়োগের সুযোগ বাতিল, অনিয়ন্ত্রিত সার ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থা রোহিত এবং ডিলার ও বিক্রয় প্রতিনিধিদের কার্যক্রম মূল্যায়নের মাধ্যমে ডিলারশিপ বাতিল বা নবায়নের বিধান রাখা হয়েছে।

বিএফএর নেতারা অবশ্য বলছেন, নীতিমালা প্রণয়নের উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের আপত্তি নেই। আপত্তি রয়েছে প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়নের সময় নিয়ে। তাদের দাবি, বিদ্যমান ডিলারদের সাথে আলোচনা না করে নীতিমালা কার্যকর করা হলে মাঠপর্যায়ে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। নির্বাচিত সরকারের সময়ে আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত নীতিমালা পুনর্বিবেচনারও দাবি জানান তারা।

তারা বলেন, বিগত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের কৃষি সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান যে নীতিমালা প্রণয়ন করে গেছেন, জারি করা নীতিমালার মধ্যে মৌলিক তেমন কোনো পার্থক্য নেই। বিএডিসির ‘কথিত’ ডিলারদের সুবিধা দিতেই নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছিলেন এমদাদ মিয়ানের নেতৃত্বাধীন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলেন, বিসিআইসির ডিলারদের প্রায় ৯০ শতাংশই বিএনপিপন্থী। ১৯৯৫ সালে বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে এই ডিলার নিয়োগ হয়েছে। বরং বিএডিসির সার ডিলাররা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হবে, তাকে বুঝাতে হবে- আপনার মায়ের হাত ধরে বিসিআইসির সার ডিলারদের জন্ম, আপনার (তারেক রহমান) হাতে তার মৃত্যু হতে পারে না।

সভায় বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিএফএ চেয়ারম্যানসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে সার ডিলারদের সমস্যা ও দাবিগুলো তুলে ধরবেন- এমন প্রস্তাব আসে। নেতারা বলেন, সরকারকে বিষয়টি বুঝিয়ে সমাধানের পথ বের করতে হবে।

দাবি আদায়ে ধাপে ধাপে কর্মসূচি নেয়ার কথাও জানান বিএফএ চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, প্রথমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেয়া হবে। এরপর সংবাদ সম্মেলন করা হবে। একই দিনে দেশের ৬৪ জেলায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন এবং জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয়া হবে। প্রয়োজন হলে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।

সভায় সার উত্তোলন বন্ধের কর্মসূচির বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তবে কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এমন কর্মসূচিতে না যাওয়ার পক্ষে মত দেন নেতারা। সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দেয়ার পরও দাবি বাস্তবায়ন না হলে পরবর্তী পর্যায়ে কঠোর কর্মসূচি বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানান তারা।

সার সরবরাহ বাড়ানোর দাবিও করেন ডিলার নেতারা। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় চাহিদার তুলনায় সরকারি বরাদ্দ কম থাকায় কৃষকদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের হিসাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম সার দেয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন বিএফএ চেয়ারম্যান। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা করে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান তিনি। একইসাথে বেসরকারি আমদানিকারকদের সার আমদানির সুযোগ বাড়ানোর দাবিও ওঠে।

ডিলারদের বেশি দামে সার বিক্রি না করার কঠোর নির্দেশ দেন বিএফএ চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কোনো সাব ডিলার/খুচরা বিক্রেতা সার বিক্রি করলে তাকে হাতেনাতে ধরে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

বিএফএর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যারা কৃষকদের সার দিয়ে আসছেন, তাদের বাদ দিয়ে হঠাৎ নতুন ব্যবস্থা করা সহজ নয়। ডিলারদের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে কোনো ডিলার অনিয়ম করলে তার দায় সংগঠন নেবে না।