২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের রাজস্ব অধ্যায়টি কেবল করহার নির্ধারণের কোনো প্রশাসনিক দলিল নয়; বরং এটি বাংলাদেশের করনীতি, বিনিয়োগ কৌশল এবং শিল্পায়ননির্ভর অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা। সরকার এক দিকে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, অন্য দিকে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ- এই তিনটি লক্ষ্যকে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করেছে। প্রস্তাবে মধ্যমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে কর ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য করার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিএনপি সরকারের পক্ষে আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ সালের এই বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন।
এই বাজেটের পদক্ষেপ বিবেচনায় সামগ্রিকভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব প্রস্তাবনাকে একটি ‘সংস্কারমুখী বাজেট’ বলা যায়। এতে এক দিকে করদাতাদের জন্য পূর্বানুমানযোগ্যতা, অন্য দিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীলতা এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টির স্পষ্ট প্রয়াস রয়েছে। তবে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু করছাড় বা নতুন নীতিমালা যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন দক্ষ বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং কর প্রশাসনের গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সেই পরীক্ষাতেই শেষ পর্যন্ত এই বাজেটের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারিত হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
করনীতিতে পাঁচ বছরের পূর্বানুমানযোগ্যতা
প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য পাঁচ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা করা। সাধারণত প্রতি বছর করহার ও করমুক্ত আয়সীমা পরিবর্তনের কারণে করদাতা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের নীতিগত অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। এবার সরকার ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমা এবং করহারের একটি রূপরেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা বর্তমান ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে তা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া নারী, প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধাদের জন্য আরো বেশি করমুক্ত আয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বাংলাদেশের করনীতিতে একটি ইতিবাচক ‘পলিসি সিগন্যাল’। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত করদাতারা তাদের ভবিষ্যৎ কর দায় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবেন এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করা সহজ হবে।
করপোরেট খাতে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগে উৎসাহ
করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তকে সরকার বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। একই সাথে অনলাইন রিটার্ন দাখিল, অডিট নির্বাচন প্রক্রিয়ার অটোমেশন, অনুমোদনযোগ্য ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎসে কর কর্তনের কারণে ব্যয় অগ্রাহ্য করার বিধান বাতিলের মতো কিছু আধুনিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমবে এবং কর পরিপালন সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে প্রশ্ন- করহার অপরিবর্তিত রেখে সরকার কিভাবে রাজস্ব বাড়াবে? বাজেট দলিলের উত্তর হলো : করভিত্তি সম্প্রসারণ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও করফাঁকি নিয়ন্ত্রণ। অর্থাৎ, করদাতার সংখ্যা বাড়ানোই হবে রাজস্ব বৃদ্ধির প্রধান পথ।
মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় কর ছাড়
দ্রব্যমূল্যের চাপে সাধারণ মানুষ যখন দীর্ঘদিন ধরে ভুগছে, তখন সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, ভোজ্যতেল, লবণ, চিনি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহার্য পণ্য, বৈদ্যুতিক বাস-ট্রাক, শিল্পের কাঁচামাল ও তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য আমদানিতে কর কমানো হয়েছে। সরকারের দাবি- এসব পদক্ষেপ উৎপাদন ব্যয় ও বাজারমূল্য কমাতে সরাসরি সহায়তাকরবে।
উৎসে কর ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন
বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হলো উৎসে করকে আর ‘ন্যূনতম কর’ হিসেবে গণ্য না করে ‘অগ্রিম কর’ হিসেবে বিবেচনা করা। এতদিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আয় কম হলেও উৎসে কর্তিত কর ফেরত পাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত ছিল। নতুন প্রস্তাবে অতিরিক্ত পরিশোধিত কর ফেরতের সুনির্দিষ্ট সুযোগ রাখা হয়েছে।
ব্যবসায়ী মহলের দীর্ঘদিনের দাবির সাথে এই সিদ্ধান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি কার্যকর হলে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নগদ প্রবাহের সঙ্কট অনেকটাই কেটে যাবে।
কর্মসংস্থান ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা
বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আইটি খাতের বাইরে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর কর অব্যাহতির প্রস্তাব, কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় করমুক্ত করা, স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের টার্নওভার ট্যাক্স শূন্যে নামিয়ে আনা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি- এসব পদক্ষেপ তরুণদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করতে পারে।
এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে শিল্প স্থাপনে ত্বরান্বিত অবচয় সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব আঞ্চলিক শিল্পায়নকে গতিশীল করবে। এর ফলে শিল্প বিনিয়োগ কেবল রাজধানীর ওপর চাপ সৃষ্টি না করে জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ডিজিটাল কর প্রশাসনের পথে
করভিত্তি সম্প্রসারণে সরকার তথ্য সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ইউটিলিটি সেবা ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য এনবিআরের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সাথে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সাথে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও এসেছে।
এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা শনাক্ত করা সহজ হবে। তবে এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার প্রশ্নটিও সমানভাবে সামনে আসবে।
শিল্পায়নের নতুন অগ্রাধিকার
আমদানি-রফতানি শুল্ক কাঠামোয় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে ভবিষ্যৎমুখী বা হাই-টেক শিল্পগুলোতে। সৌরবিদ্যুৎ, ইলেকট্রিক গাড়ি, ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, ডিজিটাল ডিভাইস, স্মার্টকার্ড, কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স ও জাহাজ শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি কর ও শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিং শিল্পে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ব্যাপক কর অব্যাহতি বাংলাদেশের শিল্পনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একইভাবে সৌরবিদ্যুৎ খাতকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করমুক্ত রাখার পরিকল্পনা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত দেয়।
রাজস্ব না বিনিয়োগ- কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
এই বাজেটের দর্শন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার তাৎক্ষণিক রাজস্ব বৃদ্ধির চেয়ে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে। করহার বাড়ানোর পরিবর্তে করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ছাড়ের মাধ্যমে শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন গড়ে তোলার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে এই কৌশলের সফলতা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে- প্রথমত. কর প্রশাসনের ডিজিটাল সংস্কার কত দ্রুত ও সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়; দ্বিতীয়ত. কর অব্যাহতির ফলে প্রত্যাশিত দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আসে কি না; এবং তৃতীয়ত. কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণে সরকার কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
শিল্পায়ন, প্রযুক্তি ও সবুজ অর্থনীতির নতুন রূপরেখা
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের রাজস্ব সংস্কার অধ্যায়ে শুধু করহার পরিবর্তন নয়, বরং দেশের শিল্পনীতি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, পরিবেশবান্ধব পরিবহন ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল স্পষ্ট হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য এক দিকে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেয়া, অন্য দিকে নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। ফলে এই বাজেটকে অনেক বিশ্লেষক ‘ট্রান্সফরমেশনাল বাজেট’ হিসেবেও দেখছেন।
ওষুধ, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশে নতুন গুরুত্ব
বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাত ইতোমধ্যে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রফতানি করছে। এই শিল্পকে আরো শক্তিশালী করতে সরকার ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ৯টি নতুন কাঁচামালে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য করার প্রস্তাব দিয়েছে।
এ ছাড়া ওষুধের মূল কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে ওষুধ রফতানির সক্ষমতা বাড়াতে আরো ১৭টি মৌলিক কাঁচামাল রেয়াতি সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপ কার্যকর হলে আমদানিনির্ভরতা কমবে, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত ওষুধ উৎপাদনে বৈশ্বিক বাজারে আরো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে পারবে।
পরিবেশ সুরক্ষায় ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের জন্য স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর নিকোটিন পাউচ ও নিকোটিন গ্র্যানুলস আমদানিতে ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব এসেছে, যা তরুণদের মধ্যে নতুন ধরনের তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করবে।
এ ছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের চলাচল সহায়ক ২১ ধরনের ডিভাইস আমদানিতে সব ধরনের শুল্ককর অব্যাহতির প্রস্তাব সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ।
বৈদ্যুতিক যানবাহনের যুগে প্রবেশের প্রস্তুতি
প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) নীতি। বর্তমানে একটি ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানিতে মোট করভার প্রায় ৯৩ শতাংশ। সরকার ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইলেকট্রিক গাড়ির ক্ষেত্রে তা কমিয়ে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত গাড়ির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে।
শুধু গাড়িই নয়, ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশন আমদানির ওপর বিদ্যমান প্রায় ৪০ শতাংশ কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাবও এসেছে। একই সাথে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি পর্যন্ত পেট্রল ও ডিজেলচালিত প্রচলিত গাড়ির করভার ১৩২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৫৬ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু সাধারণ করনীতি নয় বরং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক পরিবহনে রূপান্তরের একটি সুস্পষ্ট নীতিগত বার্তা।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বড় প্রণোদনা
ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার কম্পিউটার ও প্রযুক্তি পণ্যের আমদানিতে ব্যাপক করছাড়ের প্রস্তাব করেছে। ল্যাপটপ, ডেক্সটপ কম্পিউটার, সার্ভার, প্রিন্টার ও মনিটরের ওপর থেকে প্রায় সব ধরনের শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসএসডি আমদানিতেও উল্লেখযোগ্য কর রেয়াত দেয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে প্রযুক্তিপণ্যের দাম কমবে, ডিজিটাল শিক্ষা সম্প্রসারিত হবে এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগ আসবে। এ ছাড়া ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন আমদানিতে শুল্ক ও আগাম কর কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ক্রিয়েটিভ ইকোনমির প্রতি নজর
বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল কনটেন্ট, চলচ্চিত্র ও সৃজনশীল শিল্পকে মূলধারার অর্থনৈতিক খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে এই বাজেটে। গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিনসহ বিভিন্ন মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার এবং উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরার আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এটি সৃজনশীল শিল্পে তরুণদের অংশগ্রহণ ও পেশাদারিত্ব বাড়াতে সহায়ক হবে।
শিল্প সুরক্ষা বনাম মুক্ত বাণিজ্য
বাজেটে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য একাধিক শুল্ক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। জিপসাম বোর্ড, পিভিসি রেজিন, বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ, ট্রান্সফরমার, ওয়াশিং মেশিন, কাগজ, কপার তার, কোল্ড-রোল্ড স্টিলসহ বিভিন্ন ফিনিশড পণ্যের আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি বা নতুন রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব এসেছে।
অন্য দিকে যেসব দেশীয় শিল্পে কাঁচামালের ঘাটতি রয়েছে, উৎপাদন ধরে রাখতে সেসব ক্ষেত্রে শুল্ক কমানো হয়েছে। যেমন : ডিটারজেন্ট শিল্পের কাঁচামাল লিনিয়ার অ্যালকাইল বেঞ্জিন; রিফ্র্যাক্টরি সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল; টায়ার-টিউব শিল্পের উপকরণ; স্কিন কেয়ার পণ্যের কাঁচামাল; কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের কাঁচামাল।
এতে স্পষ্ট যে, সরকার মূলত ‘কাঁচামালে সুবিধা, সমাপ্ত পণ্যে সুরক্ষা’ নীতি অনুসরণ করছে।
কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে স্বস্তি
কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমাতে সব ধরনের সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ের ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার এবং কীটনাশকের আমদানি পর্যায়ের আগাম কর সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে হৃদরোগীদের ব্যবহৃত স্টেন্ট ও হার্টের রিংয়ের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহারের ফলে প্রতিটির দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে বলে সরকারের দাবি। এছাড়া চোখের ইনট্রাওকুলার লেন্স এবং কিডনি ডায়ালাইসিসের সরঞ্জামেও কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত
ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের বিকাশে বাজেটের অন্যতম আলোচিত সিদ্ধান্তগুলো হলো : স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট অব্যাহতি ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বর্ধিতকরণ; কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সেবার ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার; মোবাইল সিমের ওপর বিদ্যমান ৩০০ টাকার কর সম্পূর্ণ বাতিল।
সরকারের ধারণা, এসব সাহসী উদ্যোগ ডিজিটাল উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরিতে সহায়ক হবে এবং দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের দিকে আরো বেশি আকৃষ্ট করবে।
ব্যাংক আমানতকারীদের জন্য স্বস্তি
ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের উৎসাহিত করতে ব্যাংক হিসাবের ওপর আবগারি শুল্কমুক্ত সীমা তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঋণ হিসাবের বিপরীতে বছরে একাধিকবার আবগারি শুল্ক কেটে নেয়ার বিদ্যমান নিয়মের পরিবর্তে বছরে মাত্র একবার কর্তনের বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এটি একটি বড় স্বস্তির বার্তা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের রাজস্ব অংশটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, সরকার শুধু তাৎক্ষণিক রাজস্ব সংগ্রহের পেছনে না ছুটে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের দিকে বেশি নজর দিয়েছে। সবুজ জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, তথ্যপ্রযুক্তি, স্টার্টআপ, সৃজনশীল শিল্প এবং উচ্চ-মূল্য সংযোজনভিত্তিক উৎপাদন খাতকে এখানে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। একই সাথে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা এবং কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানোর প্রচেষ্টাও রয়েছে।
তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও ছাড় শেষ পর্যন্ত কতটা নতুন বিনিয়োগ টানতে পারে, কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং প্রকৃত উৎপাদন বাড়াতে পারে- সেটিই হবে আগামী কয়েক বছরের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এর সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হলে, এই বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই শিল্পায়িত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।



