শিশু-কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ‘জনস্বার্থবিরোধী পরিস্থিতি’ (পাবলিক নিউস্যান্স) সৃষ্টি করে তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলার দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্যের আদালত মেটাকে ৫৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ এবং শিশুদের জন্য প্ল্যাটফর্ম দু’টির কিছু ফিচার সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছে।
নিউ মেক্সিকোর একটি আদালত বৃহস্পতিবার এ রায় দেন। এর আগে গত মার্চে একই মামলায় জুরি বোর্ড মেটাকে শিশু-কিশোরদের প্ল্যাটফর্মে যৌন শিকারিদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়ার জন্য দায়ী সাব্যস্ত করে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছিল।
সান ফ্রান্সিসকো থেকে এএফপি জানায়, মেটা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে বলে জানিয়েছে। তবে এমন সময় এ সিদ্ধান্ত এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের আরো কয়েক ডজন অঙ্গরাজ্য শিশুদের ক্ষতি ও তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে মামলা পরিচালনা করছে। আগামী সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ায় এ ধরনের একটি বড় মামলার বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেস বলেন, ‘আজকের রায় সেই সব অভিভাবকের জন্য বিজয়, যারা তাদের সন্তানদের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। একইসাথে এটি সেই সব শিশুরও বিজয়, যারা আরো নিরাপদ অনলাইন পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার রাখে।’
তিনি বলেন, ‘এই মামলা সবসময়ই শিশুদের সুরক্ষা, পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিকে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রম থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ বন্ধ করার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য ছিল।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে ‘জনস্বার্থবিরোধী পরিস্থিতি’ সৃষ্টির জন্য দোষী সাব্যস্ত করার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে এটিই প্রথম। শিশুদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়ার অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে হাজারো মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ৫৬৭ মিলিয়ন ডলারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পাঁচ বছরে একটি মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা তহবিলে প্রদান করতে হবে।
বাকি অর্থ শিশু-কিশোরদের সম্ভাব্য অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি এবং আদালতের নির্দেশিত পরিবর্তন বাস্তবায়নে ব্যয় করা হবে।
‘লাইক’ সংখ্যা প্রদর্শনে সীমাবদ্ধতা
বিচারক ব্রায়ান বিডশাইড তার রায়ে বলেন, অটোপ্লে, ইনফিনিট স্ক্রলিং, ‘লাইক’ সংখ্যা প্রদর্শন, পুশ নোটিফিকেশন এবং অ্যালগরিদমভিত্তিক কনটেন্ট সুপারিশের মতো ব্যবহারকারীর সম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য তৈরি ফিচারগুলো কিশোর-কিশোরীদের ওপর বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে।
তিনি ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য পুশ নোটিফিকেশন এবং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সময় মাসে ৯০ ঘণ্টা অর্থাৎ গড়ে দিনে প্রায় তিন ঘণ্টায় সীমিত করার নির্দেশ দেন। এছাড়া স্কুল চলাকালীন সময়ে নির্দিষ্ট ধরনের নোটিফিকেশন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
আদালত আরো নির্দেশ দিয়েছে, ‘লাইক’ সংখ্যা প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে এবং নিউ মেক্সিকোতে ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে অ্যাকাউন্ট খোলা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এছাড়া আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে বছরে দুইবার আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে মেটাকে।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় মেটা এক বিবৃতিতে এএফপিকে জানায়, ‘আমরা এ রায়ের সাথে একমত নই এবং এর বিরুদ্ধে আপিল করব।’
প্রতিষ্ঠানটি আরো জানায়, ‘অনলাইনে কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় আমাদের কার্যক্রম নিয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসী এবং প্রকৃত তথ্য বিকৃত করে উপস্থাপন করা অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।’
সামনে আরো মামলা
চূড়ান্ত শুনানিতে প্রসিকিউটর লিন্ডা সিঙ্গার জুরিদের বলেন, মেটা শিশু-কিশোরদের জন্য ঝুঁকির বিষয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ গবেষণার তথ্য গোপন করেছে। একই সময়ে তাদের অ্যালগরিদম প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের কিশোরদের পোস্ট করা কনটেন্টের দিকে পরিচালিত করেছে।
এর আগে, মার্চ মাসে আদালত নিউ মেক্সিকোর ‘আনফেয়ার প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট’ লঙ্ঘনের দায়ে মেটাকে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালতের মতে, শিশুদের জন্য তাদের পণ্যের নিরাপত্তা সম্পর্কে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
একই ধরনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টিরও বেশি অঙ্গরাজ্য বর্তমানে মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক কিশোর মেটা, ইউটিউব, টিকটক এবং স্ন্যাপের সাথে গোপন সমঝোতায় পৌঁছানোর পর বিচার শুরুর কয়েক দিন আগে তার মামলা প্রত্যাহার করে নেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মানসিক স্বাস্থ্যগত ক্ষতি নিয়ে প্রথম ‘বেলওয়েদার’ মামলার রায় গত মার্চে হয়। সে সময় লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি জুরি ২০ বছর বয়সী এক নারীর পক্ষে মেটা ও গুগলকে ৬০ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেয়।
এছাড়া গত মে মাসে মেটা, স্ন্যাপ, টিকটক এবং ইউটিউব কেন্টাকির একটি স্কুল জেলার সাথে একই ধরনের মামলায় গোপন সমঝোতায় পৌঁছায়। বাসস


