'প্রকাশ্য সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ' প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প : গড়েছেন সম্পদের পাহাড়

'ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদের স্বার্থসংঘাত সংক্রান্ত সব বিধিনিষেধ প্রকাশ্যে অমান্য করছেন। নিজের ও পরিবারের আর্থিক সুবিধার জন্য প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যবহার করছেন। বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এর চেয়ে প্রকাশ্য দুর্নীতিবাজ সরকার আর দেখা যায়নি।'

নয়া দিগন্ত অনলাইন
বিমানে ওঠার সময় হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
বিমানে ওঠার সময় হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প |সংগৃহীত

দ্বিতীয় দফায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি অভূতপূর্ব হারে বাড়িয়ে চলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আইনি ও নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এই ঘটনাকে নজিরবিহীন দুর্নীতি হিসেবে দেখছেন।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) জানায়, ২০২৫ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সির বিশাল সমাহার, বিদেশি বিনিয়োগকারীর সুবিধা এবং নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ট্রাম্প অন্তত ২২০ কোটি ডলার আয় করেছেন।

গত জুনে জমা দেওয়া আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, শুধু ক্রিপ্টো ব্যবসা থেকেই ট্রাম্প গত বছর আয় করেন ১৪০ কোটি ডলার। অথচ তার তৈরি ক্রিপ্টো প্রকল্পে বিনিয়োগ করে প্রায় ১০ লাখ সাধারণ মানুষ হারিয়েছেন প্রায় ৩৮০ কোটি ডলার। ক্ষমতার অপব্যবহার এখানেই থেমে থাকেনি। ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল' নতুন একটি সুবিধা চালু করেছে, যেখানে মাসে ১ লাখ ডলারের বিনিময়ে ধনী ব্যক্তিরা প্রেসিডেন্টের পোস্ট সবার আগে দেখতে পাবেন। নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ ও প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীদের জন্য তৈরি এই ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করেছেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার। তিনি অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠির মাধ্যমে এমন নীতিহীন সুযোগ না নেওয়ার আহ্বান জানান।

এছাড়া, আয়কর সংক্রান্ত পুরোনো তথ্য ফাঁস নিয়ে নিজের দায়ের করা ১০ হাজার কোটি ডলারের মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে দিয়ে রফা করিয়েছেন ট্রাম্প। এর ফলে আয়কর সংক্রান্ত নিরীক্ষা থেকে তিনি ও তার পরিবার রেহাই পেতে যাচ্ছেন এবং এতে তার সাশ্রয় হবে প্রায় ১০ কোটি ডলার। জাজদের মতে, পুরো প্রক্রিয়াটিতে করদাতার খরচে প্রেসিডেন্টকে উপঢৌকন দেওয়া হয়েছে। একই সাথে, কাতারের কাছ থেকে ৪০ কোটি ডলার মূল্যের বিমান উপহার নেয়া কিংবা বিদেশের গলফ প্রকল্পে বিদেশি কোটিপতিদের অর্থায়নকে মার্কিন সংবিধানের লঙ্ঘন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের সাবেক সাধারণ পরামর্শক ল্যারি নোবেল বলেন, 'ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদের স্বার্থসংঘাত সংক্রান্ত সব বিধিনিষেধ প্রকাশ্যে অমান্য করছেন। নিজের ও পরিবারের আর্থিক সুবিধার জন্য প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যবহার করছেন। বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এর চেয়ে প্রকাশ্য দুর্নীতিবাজ সরকার আর দেখা যায়নি।'

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক জুলিয়ান জেলিজারের মতে, প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ব্যবসা ও নীতির মধ্যে একটি পাতলা পর্দা রেখেছিলেন, কিন্তু এবার তিনি সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মকানুন ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। মার্কিন নাগরিকদের মনোভাবও এর পক্ষে কথা বলছে; সিএনএনের এক সাম্প্রতিক জরিপে ৬৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ট্রাম্প দেশের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত লাভকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

২০২১ সালে যিনি ক্রিপ্টোকে 'জোচ্চুরি' বলতেন, সেই ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই খাতের ব্যাপক অর্থায়নের পর সুর বদলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে 'বিশ্বের ক্রিপ্টো রাজধানী' বানানোর ঘোষণা দেন। এরপর ২০২৫ সালে তার ডিজিটাল মুদ্রা 'ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল' থেকে আয় হয় ৭৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এছাড়া নিজের নামাঙ্কিত 'মিমকয়েন' বিক্রি করে তিনি আয় করেন আরো ৬৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও অ্যাডাম শিফ জানান, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের এই ব্যবসা সাধারণ মানুষকে পথে বসিয়েছে এবং মুষ্টিমেয় কিছু অতিধনীর পকেট ভারী করেছে। সংঘাত ও নীতিহীনতার এই রাজনীতি মার্কিন আর্থিক বাজারের স্বচ্ছতাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে।