মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম দেশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করল লেবানন

লেবাননের পার্লামেন্ট মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে এই শাস্তির বিধান বাতিল করল দেশটি। লেবাননে ২০০৪ সালের পর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
লেবাননের পতাকা
লেবাননের পতাকা |সংগৃহীত

লেবাননের পার্লামেন্ট মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে এই শাস্তির বিধান বাতিল করল দেশটি।

লেবাননে ২০০৪ সালের পর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। তবে আদালতগুলোতে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া অব্যাহত ছিল। সর্বশেষ রায়টি দেয়া হয় সোমবার।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত কমপক্ষে ৮৫ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি কারাগারে ছিলেন।

হত্যা, সন্ত্রাসবাদ ও গুপ্তচরবৃত্তির মতো গুরুতর অপরাধে সাধারণত মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো।

লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা ন্যাশনাল নিউজ অ্যাজেন্সি জানায়, এখন সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের জন্য কঠোর শ্রমসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হবে।

পার্লামেন্টে উপস্থিত বিচারমন্ত্রী আদেল নাসার মৃত্যুদণ্ড বাতিলের সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকায় আগে যেসব দেশ এ শাস্তি বাতিল করেছে, সেসব দেশ থেকে সন্দেহভাজনদের প্রত্যর্পণ করতে বৈরুত সমস্যায় পড়ত।

স্বতন্ত্র আইনপ্রণেতা ফিরাস হামদান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে সিদ্ধান্তটির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই মুহূর্তে পৌঁছাতে যারা অবদান রেখেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ।’

জাতিসঙ্ঘও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক মধ্যপ্রাচ্যের যেসব প্রতিবেশী দেশে এখনো মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, তাদের লেবাননের পথ অনুসরণ করে ‘এই অমানবিক প্রথা বন্ধের’ আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে এই সিদ্ধান্ত ‘জীবনের অধিকারের প্রতি শক্তিশালী ও নীতিনিষ্ঠ অঙ্গীকার’ প্রকাশ করে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, লেবানন ‘মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশের জন্য শক্তিশালী দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে’।

লেবাননের সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক ও সাহসী’ বলে অভিহিত করেছে।

ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো এক্সে লিখেছেন, এই ভোট প্রমাণ করে লেবানন ‘তার অস্তিত্বের ভিত্তিতে থাকা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার সক্ষমতার মাধ্যমে এখনো একটি দৃষ্টান্ত’।

‘মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও সম্মান’
অ্যাক্টিভিস্ট ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বহু বছরের প্রচারণার পর আইনটি পাস হলো।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের লেবাননবিষয়ক গবেষক রামজি কাইস বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত দেশটির মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি এমন একটি নিষ্ঠুর ও স্বেচ্ছাচারী শাস্তি থেকে স্পষ্ট বিচ্ছেদ, যা কখনোই দেয়া উচিত নয়।’

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছে।

সংস্থাটির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক হেবা মোরায়েফ বলেন, ‘এই আইনকে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে কার্যকর করতে লেবাননের কর্তৃপক্ষকে এখন সব মৃত্যুদণ্ডের রায় কমিয়ে দিতে হবে। একইসাথে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অনুমোদন দিতে হবে। পাশাপাশি মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মানের ভিত্তিতে বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বৃহত্তর সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে।’

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে, গত বছর ইরানে দুই হাজারের বেশি এবং সৌদি আরবে ৩৫০টির বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

জুনে জর্ডান নিরাপত্তাকর্মীদের হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ছয় ব্যক্তিকে ফাঁসি দেয়। এর মধ্য দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর দেশটির নয় বছরের স্থগিতাদেশের অবসান ঘটে।

প্রতিবেশী ইসরাইলে মাত্র দুবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে এক সামরিক ক্যাপ্টেনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এরপর ১৯৬২ সালে নাৎসি যুদ্ধাপরাধী অ্যাডলফ আইখম্যানকে ফাঁসি দেয়া হয়।

তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে ইসরাইলের পার্লামেন্ট প্রাণঘাতী হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার অনুমতি দিয়ে নতুন আইন পাস করেছে।

জাতিসঙ্ঘে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশের পক্ষে লেবানন বারবার ভোট দিয়েছে। এ বিষয়ে ২০২৪ সালের একটি প্রস্তাবও সমর্থন করেছে দেশটি।

লেবাননে জাতিসঙ্ঘের বিশেষ সমন্বয়কারী জ্যঁ আরনো বলেন, সর্বশেষ পদক্ষেপটি ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং মানবিক মর্যাদার সাথে ন্যায়বিচারের প্রতি দেশটির অঙ্গীকার আরো এগিয়ে নিয়েছে’।

চলমান আইনসভা অধিবেশনে আলোচনার জন্য উত্থাপিত একাধিক বিলের অংশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা হয়েছে। এসব বিলের মধ্যে বহু বছর ধরে আলোচিত সাধারণ ক্ষমা আইনও রয়েছে।

সূত্র: বাসস