- ফারজানা খাতুন
কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ ঐতিহাসিকভাবেই যেকোনো জাতির ধনসম্পদ ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান উৎস। মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরে হরমুজ প্রণালী ঘিরে চলমান সংকট বিশ্বের সামুদ্রিক নিরাপত্তার এই বাস্তবতাকে আবারও স্পষ্ট করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার পর, ইরান কৌশলগতভাবে এই সংকুচিত জলপথকে ব্যবহার করে যুদ্ধের ভারসাম্য নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করছে। ‘অননুমোদিত’ জাহাজের চলাচল অবরুদ্ধ রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ইতিহাসের বৃহত্তম সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পারস্য উপসাগরের এই গভীর সংকটের উত্তাপ যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়া দিচ্ছে, তখন বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত নিরাপত্তায় এর প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশের নৌ-কৌশলবিদদেরও হিসাব-নিকাশ শুরু করতে হচ্ছে।
সিক্স ডিগ্রি চ্যানেল: বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য সংঘাতের নতুন কেন্দ্রবিন্দু
বাংলাদেশ একটি সামুদ্রিক নির্ভর দেশ, যার বঙ্গোপসাগর বরাবর ৫৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম এই ত্রিভুজাকার উপসাগর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক কনটেইনার চলাচলের ৫০ শতাংশ পরিচালিত হয়। বঙ্গোপসাগর একটি উন্মুক্ত অববাহিকা হওয়ায় হরমুজ প্রণালীর মতো কোনো একক সংকুচিত বের হওয়ার পথ এতে নেই। তবে এর আশেপাশের কয়েকটি জলপথ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ‘সিক্স ডিগ্রি চ্যানেল’ (Six Degree Channel)।
১৬৩ কিলোমিটার প্রশস্ত এই চ্যানেলটি ‘গ্রেট চ্যানেল’ নামেও পরিচিত, যা উত্তর ৬ ডিগ্রি অক্ষাংশের কাছে অবস্থিত। এটি ভারতের গ্রেট নিকোবর দ্বীপকে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপ থেকে পৃথক করে বঙ্গোপসাগরকে আন্দামান সাগরের সাথে যুক্ত করেছে। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সামুদ্রিক বাণিজ্যের একটি সিংহভাগ এই চ্যানেল দিয়েই অতিক্রম করে।
চ্যানেলটি ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অতি নিকটে হওয়ায়, নতুন দিল্লি বিমান, যুদ্ধজাহাজ ও রাডার দিয়ে এর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাতে পারে। যেকোনো সশস্ত্র সংঘাতের সময় প্রতিপক্ষকে আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও রাখে তারা। এই লক্ষ্যেই ভারত তার বিমান ও নৌ সক্ষমতা বাড়াতে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ‘গ্রেট নিকোবর দ্বীপ উন্নয়ন প্রকল্প’ (GNIDP) বাস্তবায়ন করছে, যা মূলত নিকটবর্তী মালাক্কা প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করারই অংশ।
ভারতের 'হরমুজ অস্ত্র' ও চীনের মালাক্কা দ্বিধা
পারস্য উপসাগরে হরমুজ সংকটের পর ভারতীয় বিশ্লেষণগুলোতে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে যে, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ওপর ভিত্তি করে ভারতও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে একই ধরনের ‘অবরোধ’ তৈরি করার সামর্থ্য রাখে। চীন ও ভারতের মধ্যকার কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। চীন তার কৌশলগত কাঁচামাল ও জ্বালানি আমদানির জন্য সংকুচিত মালাক্কা প্রণালীর ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল—যাকে বলা হয় চীনের "মালাক্কা দ্বিধা" (Malacca Dilemma)।
ভারতীয় সামরিক কৌশলবিদদের মতে, ভবিষ্যতে চীন-ভারত যুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর 'আন্দামান ও নিকোবর কমান্ড' এই সিক্স ডিগ্রি চ্যানেল অবরুদ্ধ করে দিতে পারে। এর ফলে মালাক্কা প্রণালী দিয়ে চীনের প্রবেশপথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে।
তবে হরমুজের কোনো বিকল্প না থাকলেও সিক্স ডিগ্রি চ্যানেলের বেশ কিছু বিকল্প পথ রয়েছে। যেমন—আন্দামান ও নিকোবরের মধ্যবর্তী টেন ডিগ্রি চ্যানেল, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের পূর্বাঞ্চলীয় অন্যান্য রুট কিংবা ইন্দোনেশিয়ার সুন্দা ও লম্বক প্রণালী। ফলে ভারত চাইলেই পুরোপুরি অবরোধ করতে না পারলেও, সংঘাতের সময় সিক্স ডিগ্রি চ্যানেল অবরুদ্ধ করার যেকোনো চেষ্টা বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্য চেইনকে স্তব্ধ করে দিতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তায় প্রভাব
বঙ্গোপসাগর বা এর সংযোগস্থলে কোনো সংকট দেখা দিলে তা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামাবে। বাংলাদেশের ৯০০ কোটি ডলারের বেশি সেবামুখী ও পণ্য বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়, যার একটি বিশাল অংশ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর (চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামী ইত্যাদি) সাথে সম্পাদিত হয়। সিক্স ডিগ্রি চ্যানেল বা সংলগ্ন এলাকায় কোনো বাধা তৈরি
হলে বাংলাদেশের সামনে চারটি প্রধান ঝুঁকি দেখা দেবে:
১. বাণিজ্য ট্রানজিটে দীর্ঘসূত্রতা: চ্যানেল বন্ধ বা সীমিত হলে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হবে, অথবা অতিরিক্ত জাহাজ পরিদর্শনের মুখোমুখি হতে হবে। এতে বাণিজ্য খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় আঘাত হানবে।
২. জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট: বাংলাদেশ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, এলএনজি (LNG) ও কয়লা আমদানি করে। এই রুট ব্যাহত হলে জ্বালানি সরবরাহ বিলম্বিত হবে, শিপিং ও বিমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের বাজারে বিদ্যুত ও জ্বালানির দাম চরম আকার ধারণ করবে।
৩. সামরিক সীমাবদ্ধতা: বাংলাদেশ নৌবাহিনী একটি 'গ্রিন-ওয়াটার নেভি' (উপকূলীয় প্রতিরক্ষানির্ভর নৌবাহিনী)। ফলে সিক্স ডিগ্রি চ্যানেলের মতো দূরবর্তী সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বিধান বা বাণিজ্য সুরক্ষার সামরিক সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই।
৪. কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন হ্রাস: নিজস্ব সুরক্ষার সামরিক ক্ষমতা না থাকায়, সংকটকালে অর্থনৈতিক পথ খোলা রাখতে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর ওপর নির্ভর করতে হবে। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে (Strategic Autonomy) খর্ব করতে পারে।
সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের করণীয় কৌশল
বঙ্গোপসাগরের সম্ভাব্য সামুদ্রিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য তিন ধাপের কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা: সামরিক উত্তেজনায় না জড়িয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় জোর দেওয়া। কৌশলগত জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য মজুদ (Strategic Reserves) বাড়ানো, সামুদ্রিক নজরদারি সেল গঠন করা এবং শিপিং ও বিমা বাজারের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা।
মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা: দেশীয় বন্দরগুলোর (চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা ও মাতারবাড়ি) আধুনিকায়ন ও ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা, বিদেশী জাহাজের নির্ভরতা কমাতে জাতীয় মার্চেন্ট শিপিং বহর সম্প্রসারণ করা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে কোস্টগার্ড ও নৌ-সহযোগিতা জোরদার করা।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা: নিজস্ব ব্লু-ওয়াটার নৌ-সক্ষমতা (গভীর সমুদ্রে অপারেশনের সক্ষমতা) অর্জন করা, জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে বিশ্বমানের করা, নিজেদের বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা সুসংহত করা এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক নীতি বজায় রেখে ভারতসহ আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে সামুদ্রিক সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।
উপসংহার
পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী সংকট প্রমাণ করেছে যে, বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার দুর্বলতম স্থানে আঘাত হেনে কীভাবে বিশাল ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া যায়। সিক্স ডিগ্রি চ্যানেল হরমুজের মতো সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করার মতো জলপথ না হলেও, ভারতের কৌশলগত অবস্থান একে আঞ্চলিক সংঘাতের সময়ে বড় অস্ত্রে পরিণত করেছে।
লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।


