সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ‘সফট পাওয়ার’ বা নরম ক্ষমতা। সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, কূটনীতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির মাধ্যমে অন্য দেশ ও জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তারের এই প্রতিযোগিতায় দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে চীনের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে।
‘সফট পাওয়ার’ ধারণাটি জনপ্রিয় করেন মার্কিন রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জোসেফ নাই। তার মতে, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে কোনো দেশের সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও পররাষ্ট্রনীতির আকর্ষণের মাধ্যমে অন্যদের প্রভাবিত করার ক্ষমতাই সফট পাওয়ার।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র এই ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ। হলিউড, সংগীত, প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষা, জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কারণে বিশ্বজুড়ে দেশটির ব্যাপক সাংস্কৃতিক প্রভাব তৈরি হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র বদলাচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বাড়ছে।
প্রায় দুই দশকের মধ্যে এই প্রথম, গত মাসে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের নতুন এক জরিপে দেখা গেছে—চীনের প্রতি অধিকাংশ দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি ইতিবাচক। ৩৬টি দেশের ৪২ হাজারের বেশি মানুষের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পরিচালিত এই জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
জরিপে দেখা যায় ৩৭টি দেশে গড়ে ৫১ শতাংশ মানুষ চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে চীনের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে ৩৯ শতাংশের। সাব-সাহারান আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তুলনামূলক বেশি।
অন্যদিকে, ৩৬টি দেশের মধ্যে মাত্র ছয়টিতে চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেশি ইতিবাচক মনোভাব পাওয়া গেছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও ইসরাইল—যাদের বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
চীনের এই অগ্রগতির পেছনে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বড় ভূমিকা রাখছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ করেছে বেইজিং। উন্নয়নশীল অনেক দেশের কাছে চীন এখন অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভূমিকা দেশটির সফট পাওয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের অনেকে।
যুদ্ধ, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনাও রয়েছে।
তবে সফট পাওয়ারের প্রতিযোগিতায় চীনের এগিয়ে যাওয়া মানেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক শক্তি।
বরং সাম্প্রতিক প্রবণতা ইঙ্গিত করছে, বিশ্বব্যাপী প্রভাব ধরে রাখতে সামরিক শক্তির পাশাপাশি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, কূটনৈতিক আস্থা ও সাংস্কৃতিক আকর্ষণও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার ভবিষ্যৎ শুধু কে বেশি শক্তিশালী—তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং বিশ্বের মানুষ কোন দেশকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য, আকর্ষণীয় ও সহযোগিতামূলক শক্তি হিসেবে দেখছে—সেটিও নির্ধারণ করবে বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ।
অনুবাদ: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।


