মাদরাসা নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন ভারতের উত্তরপ্রদেশের উপ-মুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য। আর এর তীব্র প্রতিবাদ করেছেন দেশটির প্রভাবশালী আলেম, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি ও দারুল উলুম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিসীন মাওলানা আরশাদ মাদানি।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভারতের একটি সংবাদমাধ্যম বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, মৌর্য মাদরাসাগুলোকে ‘সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র’ আখ্যা দিয়েছেন। যার ফলে মাওলানা মাদানি এই প্রতিবাদ জানান।
মাওলানা আরশাদ মাদানি মৌর্যের এই বক্তব্যকে ‘সাম্প্রদায়িকতা ও বিদ্বেষের চরম নিদর্শন’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এ ধরনের মন্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন, উসকানিমূলক এবং সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত একজন ব্যক্তির জন্য অশোভন।
তিনি বলেন, মাদরাসাগুলোকে সন্ত্রাসের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা কেবল ভারতের ধর্মীয় ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ ঐতিহ্যের প্রতিই অবমাননা নয়; বরং এটি ভারতের সংবিধানের চেতনারও পরিপন্থী, যা আইনের চোখে সমতা, সকল নাগরিকের জন্য সমান অধিকার এবং সকল ধর্ম ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধার নিশ্চয়তা দেয়।
তিনি বলেন, ‘কেবলমাত্র এমন ব্যক্তিই এ ধরনের অভিযোগ করতে পারেন যে ভারতের ইতিহাস ও তার মাদরাসাগুলো সম্পর্কে অজ্ঞ এবং যার চিন্তাভাবনা পক্ষপাতদুষ্ট।’
তিনি আরো যোগ করেন, লাখ লাখ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তাদের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও স্নাতকদেরসহ সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেয়া অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এটি সামাজিক সম্প্রীতি বিঘ্নিত করার একটি প্রচেষ্টা।
মাদরাসাগুলোর ঐতিহাসিক অবদানের কথা উল্লেখ করে মাওলানা মাদানি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষিত পণ্ডিতেরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম দিকের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন এবং দেশের জন্য অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, তারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে কারাবাস, নির্বাসন ও নিপীড়ন সহ্য করেছেন, কিন্তু জাতীয় স্বাধীনতার আদর্শের সাথে কোনো আপস করেননি।
তিনি বিশেষভাবে দারুল উলুম দেওবন্দের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করে বলেন, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এর আলেম ও ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি তাদের আত্মত্যাগকে ‘ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়, যা কখনো ভোলা যাবে না’ বলে বর্ণনা করেন।
মাওলানা মাদানি ইতিহাসের একটি ‘অন্ধকার অধ্যায়’র কথাও উল্লেখ করেন এবং অভিযোগ করেন যে যখন দেওবন্দের আলেমগণ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন, তখন তৎকালীন কিছু সাম্প্রদায়িক ও ব্রিটিশপন্থী নেতা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমা ও সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে প্রাণভিক্ষার আবেদন জমা দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, এই আবেদনগুলো ঐতিহাসিক নথির অংশ এবং তিনি এগুলোর সাথে মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দি, মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি এবং মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধির মতো আলেমদের ত্যাগের তুলনা করেন, যারা ব্রিটিশ শাসনের কাছে আত্মসমর্পণের পরিবর্তে কারাবাস ও নির্বাসন বেছে নিয়েছিলেন।
জমিয়ত প্রধান অভিযোগ করেছেন যে, নির্বাচনী ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থে মাদরাসাগুলোকে বারবার টার্গেট করা হচ্ছে। তার মতে, বিভিন্ন সময়ে তাদের পাঠ্যক্রম, দেশপ্রেম এবং এখন সন্ত্রাসবাদের সাথে তাদের কথিত যোগসূত্র নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ড সমাজে ঘৃণা, বিভেদ ও অবিশ্বাস ছড়ানোর লক্ষ্যে পরিচালিত একটি রাজনৈতিক মানসিকতারই প্রতিফলন।
তিনি আরো বলেন, উপ-মুখ্যমন্ত্রীর পদটি ধর্ম বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নির্বিশেষে সকল নাগরিকের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সাংবিধানিক পদ। সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হলো- এমন কোনো মন্তব্য করার পরিবর্তে ঐক্য, আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে শক্তিশালী করা, যা লাখ লাখ মানুষের অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এবং সামাজিক সম্প্রীতিকে দুর্বল করতে পারে।
মাওলানা মাদানি বলেন, ঘৃণার জবাব ঘৃণা দিয়ে দেয়া উচিত নয়, তবে ইতিহাস বিকৃত করা, মাদরাসাগুলোকে কলঙ্কিত করা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক উপায়ে মোকাবেলা করা অব্যাহত থাকবে।


