- তামান্না আক্তার
গত ১৮ মাসে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ পাকিস্তানকে একটি কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছে। সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত কূটনৈতিক যোগাযোগ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদ নিয়ে চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে সক্রিয় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের উষ্ণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
একই সময়ে গত মে মাসে স্বল্পমেয়াদি পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় চীন পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রমাণ দিয়েছে। গত মে মাসে ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিসরে দেশটির সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়েছে। এর ফলে পাকিস্তান-সৌদি আরব প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গেও এ ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরকে নিয়ে ইসলামী ‘কোয়াড’ গঠনের পথও তৈরি হয়েছে। চলমান সংঘাতে নিরপেক্ষ অবস্থান ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকার কারণে ইরানের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক ও প্রভাবও বেড়েছে।
পাকিস্তানের এই সৌভাগ্যজনক পরিস্থিতি, সামরিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দক্ষ কূটনীতির ফলে দেশটি যে উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলো পেতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব বৃদ্ধি; ভারতের আগ্রাসনের সম্ভাবনা হ্রাস; অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন; উপসাগরীয় অঞ্চল, পশ্চিমা দেশ ও চীন থেকে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা বৃদ্ধি; আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিসরে বাণিজ্য সম্প্রসারণ; প্রতিরক্ষা উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উন্নত প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার।
আমাদের লক্ষ্যও হতে হবে উচ্চাভিলাষী। বর্তমান অনুকূল পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি ঋণে আরও বেশি প্রবেশাধিকার পাওয়ার চেষ্টা করার পাশাপাশি পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণের একটি টেকসই পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা করা উচিত। কারণ, এই ঋণের সুদ ও দায় মেটাতেই জাতীয় বাজেটের ৬০ শতাংশের বেশি ব্যয় হচ্ছে।
বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে অবকাঠামো, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা উন্নত করে আমাদের কৃষির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। বর্তমানে জিডিপির মাত্র ১০ শতাংশে থাকা উৎপাদন খাতকে অন্তত ২০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানিযোগ্য উদ্বৃত্ত উৎপাদন সম্ভব হবে।
শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সস্তা ও পর্যাপ্ত জ্বালানি উৎপাদন করতে হবে। ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ডেটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কেন্দ্রগুলো পরিচালনার জন্যও বিপুল জ্বালানি প্রয়োজন হবে। এ লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিপুল সূর্যালোকের পূর্ণ ব্যবহার করে ব্যাপক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ভবিষ্যতের জ্বালানি হিসেবে অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন উৎপাদনে উৎসাহ দিতে হবে। একই সঙ্গে থার কয়লার বিপুল মজুত—প্রায় ১৭ হাজার কোটি টন—দক্ষতার সঙ্গে এবং বৃহৎ পরিসরে উত্তোলন করতে হবে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কয়লা থেকে তরল জ্বালানি ও গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব হবে এবং তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।
দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পেশাদারভাবে প্রণয়ন, কাঠামোবদ্ধ ও বাস্তবায়নযোগ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পকে সহায়তা দিতে হবে। প্রযুক্তি প্রাপ্তির ওপর থাকা বিধিনিষেধ প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও উড়োজাহাজসহ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দেশীয় উৎপাদন দ্রুত বাড়াতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য দ্বিতীয় আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জনের জন্য এসএসবিএমএস (SSBMS) সংগ্রহ করতে হবে। জিসিসি, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের কৌশলগত প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের লক্ষ্য অর্জন এবং অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা প্রকল্পে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
তবে আপাতত ভারতের স্থায়ী আগ্রাসনের হুমকিকে একপাশে রাখলেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা এসব সুযোগ কাজে লাগানোর সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
প্রথমত, ইরান যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি হবে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) যে পরিস্থিতির কথা কল্পনা করা হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র ও জিসিসিভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইরানের শান্তি ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা। তবে এমনটি নিশ্চিত নয়। সংঘাত শেষ হলেও পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ অচলাবস্থায় পৌঁছানোর সম্ভাবনাও সমানভাবে রয়েছে। যুদ্ধ বন্ধ হতে পারে, কিন্তু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং বিভিন্ন মাত্রায় জিসিসিভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে উত্তেজনা থেকে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ইরান, জিসিসি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে আবারও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে। সৌদি আরব, কুয়েত এবং সম্ভবত অন্যান্য জিসিসিভুক্ত রাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো ইরানের সঙ্গে ঘর্ষণ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে তেহরান যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন প্রতিহত করার নিজেদের ‘সাফল্যে’ আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত ইতিবাচক সম্পর্ক চাপের মুখে পড়তে পারে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সিনেটও তাদের দখলে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতি পাকিস্তানের নেতৃত্বের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে কিছুটা দুর্বল করতে পারে এবং ওয়াশিংটনে ভারতপন্থী প্রভাবশালী শক্তিগুলোকে আবারও সক্রিয় করে তুলতে পারে।
এ ছাড়া ইরান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ট্রাম্পের মনোযোগ অন্যদিকে সরে যেতে পারে। ফলে তার এজেন্ডায় পাকিস্তানের গুরুত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়লে সেই ব্যর্থতার দায় মধ্যস্থতাকারীদের ওপরও চাপানো হতে পারে।
তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ হুমকিও এসব সুযোগ কাজে লাগানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি—বিশেষ করে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় বারবার সন্ত্রাসী হামলা—বিনিয়োগ প্রবাহ ও প্রকল্প বাস্তবায়নকে নিরুৎসাহিত করবে, যেমনটি আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি। ফলে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে একটি সমন্বিত সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করা এবং আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরে (এজেকে) অস্থিরতা সৃষ্টি ঠেকানো অত্যন্ত জরুরি।
চতুর্থত, অর্থনৈতিক সুশাসনের উন্নতি না হলে পাকিস্তান বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ হারাতে পারে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও বড় বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর অধিকাংশই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি উপসাগরীয় দেশগুলো যেসব প্রকল্পে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলোরও অনেকগুলো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
নিরাপত্তা উদ্বেগ এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির একটি কারণ। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। বিনিয়োগ প্রস্তাব ও প্রকল্প প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক ও কাঠামোগত নানা প্রতিবন্ধকতা—উচ্চ করপোরেট কর, উৎপাদন খাতের পরিবর্তে অলাভজনক রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগে উৎসাহ, দুর্নীতি, গাফিলতি ও অদক্ষতা—দশকের পর দশক ধরে দেশটির অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন সুচিন্তিত নীতি, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং জাতীয় স্বার্থ ও অঙ্গীকার দ্বারা পরিচালিত কার্যক্রম। এ লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের জন্য বিশেষায়িত কর্মগোষ্ঠী গঠন করা যেতে পারে। এসব কর্মগোষ্ঠীতে দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা সর্বোত্তম দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তাদের দায়িত্ব হবে সংশ্লিষ্ট খাতের নীতি প্রণয়ন, নির্দিষ্ট প্রকল্প ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন তদারক করা। এসব কার্যক্রমে দেশের নেতৃত্বের পূর্ণ সমর্থন থাকতে হবে।
মূল লেখক: মুনির আকরাম,জিও নিউজ।
অনুবাদ: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।


