বদলে যাচ্ছে আবহাওয়ার ধরণ: ছন্দ হারাচ্ছে কাশ্মীর

নয়া দিগন্ত ডিজিটাল
  • সুমাইয়া ইয়াসমিন

কাশ্মীর উপত্যকার চিরচেনা আবহাওয়ায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে ঋতুচক্রের ওপর ভিত্তি করে এই অঞ্চলের কৃষি, জলসম্পদ ও মানুষের জীবনযাত্রা পরিচালিত হয়ে এসেছে, তা এখন আর আগের নিয়মে চলছে না। স্থানীয় অধিবাসী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, কাশ্মীরের আবহাওয়া তার পুরনো ছন্দ হারিয়ে ফেলছে।

শীতকালের পরিবর্তন ও তুষারপাতের ঘাটতি

কাশ্মীরের শীতকাল ঐতিহাসিকভাবে সুনির্দিষ্ট তিনটি পর্বে বিভক্ত:

চিল্লাই কালান (Chillai Kalan): ২১ ডিসেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা ৪০ দিনের তীব্র শীতের সময়।

চিল্লাই খুরদ (Chillai Khurd): ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২০ দিনের মৃদু শীত।

চিল্লাই বাচ্চা (Chillai Bacha): ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত ১০ দিনের শেষ শীতের আমেজ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ঋতুচক্রে বড় ধরনের ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে 'চিল্লাই কালান'-এর চরম ঠান্ডার দিনগুলোতে সমতল ভূমিতে ভারী তুষারপাত প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। পর্বতমালায় বরফ জমার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যা গ্রীষ্মকালে নদী-নালা ও সেচের পানির প্রধান উৎস।

কাশ্মীরে বসন্ত ও গ্রীষ্মের আগমন ঘটছে সময়ের অনেক আগেই। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসেই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক উঁচুতে উঠে যাচ্ছে। এর ফলে শীতকালীন তুষারপাত দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি পানির সুষম প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।

আবহাওয়ার নিয়মিত ছন্দের বদলে এখন দেখা যাচ্ছে আকস্মিক ও চরমভাবাপন্ন পরিবর্তন:

দীর্ঘ খরার প্রখরতায় শুকিয়ে যাওয়া খাল-বিল: টানা শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে নদী ও জলাশয়ের পানির স্তর নেমে যাচ্ছে।

অসময়ে অতিবৃষ্টি ও মেঘভাঙা বৃষ্টি (Cloudburst): স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ফলে আকস্মিক বন্যা ও ধসের ঝুঁকি বাড়ছে।

আবহাওয়া ও ঋতুচক্রের এই পরিবর্তন কাশ্মীরের প্রধান দুটি অর্থনৈতিক ভিত্তি—কৃষি ও পর্যটন—উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে:

আপেল ও জাফরান চাষ: অসময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও পর্যাপ্ত তুষারপাতের অভাবে আপেল বাগান ও জাফরান ক্ষেতের উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জলবিদ্যুৎ ও সুপেয় পানি: হিমবাহ ও পর্বতশীর্ষে বরফের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় নদীগুলোর নাব্যতা কমছে, যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং খাবার পানির সরবরাহে।

জলবায়ু গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন (Global Warming) এবং 'ওয়েস্টার্ন ডিস্টারবেন্স' বা পশ্চিমা ঝঞ্ঝার গতিপথ পরিবর্তনের কারণেই হিমালয় অঞ্চলের আবহাওয়া এমন রূপ নিচ্ছে। আবহাওয়ার এই অনিশ্চয়তা কাটাতে সময়মতো পূর্বাভাস ব্যবস্থা জোরদার করা এবং পরিবেশবান্ধব দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।