পরাশক্তির সামরিক স্নায়যুদ্ধ : চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় প্রশান্ত মহাসাগরে তীব্র মেরুকরণ

গত জুলাই মাসে চীন প্রশান্ত মহাসাগরে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর এটিই প্রশান্ত মহাসাগরে বেইজিংয়ের প্রথম কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
গত জুলাই মাসে চীন প্রশান্ত মহাসাগরে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করে।
গত জুলাই মাসে চীন প্রশান্ত মহাসাগরে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করে। |সংগৃহীত

প্রশান্ত মহাসাগরে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম চীনের একটি আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা অঞ্চলের ছোট ছোট দেশগুলোর 'শান্তির মহাসাগর' গড়ার স্বপ্নকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) জানিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অঞ্চলের প্রভাব বিস্তারের যে প্রতিযোগিতা চলছে, এই পরীক্ষার মাধ্যমে তাতে আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। একই সাথে, এ নিয়ে অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যেও মতভেদের দেয়াল আরো চওড়া হয়েছে।

গত জুলাই মাসে চীন প্রশান্ত মহাসাগরে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর এটিই প্রশান্ত মহাসাগরে বেইজিংয়ের প্রথম কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা। কাকতালীয়ভাবে, ফিজি ও অস্ট্রেলিয়া তাদের প্রথম ঐতিহাসিক নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় এই শক্তিপ্রদর্শন করে বেইজিং।

তবে ঘটনার এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সুভায় আয়োজিত বৈঠকে চীনের এই সামরিক তৎপরতার বিরুদ্ধে যৌথ কোনো নিন্দা প্রস্তাব পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যদিও অনেক দেশের প্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে ও আড়ালে অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা স্পষ্ট করেছেন।

সংশ্লিষ্ট বৈঠকের ফাঁকে পাপুয়া নিউ গিনির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাস্টিন তকাতচেঙ্কো রয়টার্সকে বলেন, 'চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা একেবারেই অনুচিত। চীন আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও মিত্র, কিন্তু তাদের এই পদক্ষেপ কোনো কাজে আসবে না।' তিনি জানান, ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়ার আগে চীন তাদের সতর্ক বার্তা দিলেও তা ঠিক কোথায় গিয়ে পড়বে, সেই এলাকা বা স্থানাংক নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি।

অবশ্য চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং সে সময় দাবি করেন, পরীক্ষাটি অত্যন্ত 'নিরাপদভাবে' পরিচালিত হয়েছে। অন্যান্য দেশগুলোকে বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি না করার পরামর্শও দেয় বেইজিং।

প্রশান্ত মহাসাগরে এখন দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সামরিক মহড়া তুঙ্গে। তাসমান সাগরে চীনা নৌবাহিনীর তাজা গোলাবারুদ দিয়ে সামরিক মহড়া থেকে শুরু করে গুয়াম ও হাওয়াই দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মহড়া—সব মিলিয়ে নৌসীমা এখন টালমাটাল। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই হাওয়াই, গুয়াম ও মার্শাল আইল্যান্ডসে নিজেদের বিশাল সামরিক ঘাঁটি বজায় রেখেছে।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি কেবল চীনের এই পদক্ষেপ নয়, বরং অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ত্রিদেশীয় সামরিক জোট 'ওকাস' —যার মাধ্যমে অঞ্চলটিতে পারমাণবিক সাবমেরিন আনা হচ্ছে—তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। টুভালুর পররাষ্ট্র সচিব পাসুনা তুয়াগা ব্যক্তিগত মত হিসেবে জানান, এমন সামরিক চুক্তিগুলো পুরো অঞ্চলকে বিপজ্জনক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অথচ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এই অঞ্চলের নেতারা এক হয়ে 'ওশন অব পিস' বা 'শান্তির মহাসাগর' ঘোষণা যৌথভাবে অনুমোদন করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক ডেভিড পিবলস জানান, বাইরের পরাশক্তিগুলো যাতে নিজেদের কৌশলে এই অঞ্চলকে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্যই ছোট দেশগুলো এক হয়ে নিজেদের জন্য শান্তির সনদ বানিয়েছিল।

কিন্তু সুভার এক দিনের বৈঠক শেষে চীনের বিরুদ্ধে কোনো যৌথ বক্তব্য তো এলোই না, উল্টো ফাটল দেখা গেল ঐক্যে। তথ্য অনুযায়ী, কিরিবাতি ও নাউরু—যারা ২০১৯ এবং ২০২৪ সালে তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে বেইজিংয়ের দিকে ভিড়েছে—তারা চীনবিরোধী খসড়া প্রস্তাবের শব্দচয়নে আপত্তি জানায়। নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স কোনো দেশের নাম না নিয়ে সরাসরি এই ব্যর্থতার পেছনে বিদেশি হস্তক্ষেপকে দায়ী করেছেন।

অন্যদিকে, সোলোমন দ্বীপপুঞ্জের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিক হুয়েনিপ্রওয়েলা মনে করেন, নিরাপত্তা রূপরেখা কেবল প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর তৈরি ও নির্দেশিত হওয়াই উচিত। কিন্তু বাস্তবতার মুখে ফিজির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাকিয়াসি দিতোকা জানান, সব দেশ যুদ্ধ সরঞ্জাম মুক্ত থাকতে চাইলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও অবৈধ মৎস্য শিকার ঠেকানোর নিরাপত্তার প্রয়োজনে কোনো না কোনো শক্তির সাথে ভারসাম্য বজায় রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

এমন এক জটিল মেরুকরণের মধ্যেই তিন সপ্তাহ পর পালাউয়ে বসতে যাচ্ছে 'প্যাসিফিক আইল্যান্ডস ফোরাম'-এর শীর্ষ সম্মেলন। চীনা ক্ষেপণাস্ত্রের সেই ছায়া আর আঞ্চলিক ঐক্যের কঠিন সমীকরণ নিয়েই মুখামুখি হতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপ্রধানরা।