যুক্তরাজ্যের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিক নাইজেল ফ্যারাজ বৃহস্পতিবার তার সংসদীয় আসন ধরে রাখার লড়াইয়ে নামছেন। এ নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন বিদ্রুপাত্মক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কাউন্ট বিনফেস।
ফ্যারাজ অভিবাসন বিরোধী রিফর্ম ইউকে দলের নেতা। গত মাসে ক্ল্যাকটন-অন-সি আসনের এমপি পদ থেকে তার পদত্যাগের পর এ উপনির্বাচনের আয়োজন করা হয়।
তবে নিজের আর্থিক বিষয় নিয়ে তদন্তের মধ্যে তার আকস্মিক পদত্যাগের সিদ্ধান্ত উল্টো ফল দিতে পারে। কারণ বড় কোনো রাজনৈতিক দলই প্রার্থী দেয়নি। তারা ফ্যারাজের এ উদ্যোগকে ‘লোক দেখানো কৌশল’ বলে অভিহিত করেছে।
এ অবস্থায় নিজেকে ‘সিগমা আইএক্স-এর আন্তঃগ্যালাকটিক মহাকাশযোদ্ধা ও রিসাইক্লনদের নেতা’ হিসেবে পরিচয় দেয়া কাউন্ট বিনফেস তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন।
কী ঘটছে
২০২৪ সালে অষ্টমবারের চেষ্টায় নির্বাচিত হন ফ্যারাজ। তিনি ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে ২১ হাজার ২২৫ ভোটে জয়ী হন।
তবে নিজের আর্থিক বিষয় নিয়ে সংসদীয় দুর্নীতি পর্যবেক্ষণ সংস্থার তদন্তের মধ্যে ৮ জুলাই তিনি এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
চিরাচরিত নাটকীয় ভঙ্গিতে ৬২ বছর বয়সী ফ্যারাজ বলেন, পরবর্তী উপনির্বাচনে তিনি আবারো প্রার্থী হবেন। তিনি এ নির্বাচনকে ‘জনগণ বনাম অভিজাতদের উপনির্বাচন’ হিসেবে তুলে ধরেন।
২০১৬ সালের গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে বিপুল ভোট দেয়া পূর্বাঞ্চলীয় এসেক্সের সমুদ্রতীরবর্তী অবকাশকেন্দ্র ক্ল্যাকটনে জনমত জরিপ অনুযায়ী, বড় ব্যবধানে ফ্যারাজই আবার নির্বাচিত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে মাথায় ধূসর আবর্জনার ঝুড়ি পরে এবং কেপ ও রুপালি বর্ম পরা কাউন্ট বিনফেস এক-পঞ্চমাংশ ভোট পেতে পারেন বলে সুরভেশন-এর এক জনমত জরিপে বলা হয়েছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মোট ৩৪ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যুক্তরাজ্যের যেকোনো সংসদীয় নির্বাচনে এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রার্থী। তাদের বেশিভাগই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ব্যালট পেপারের দৈর্ঘ্য প্রায় এক মিটার হবে। প্রায় ৭৮ হাজার ২৪৫ জন ভোটারকে নিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন আলোচনায় ফ্যারাজ?
বর্তমান এমপির পদত্যাগ, মৃত্যু অথবা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কারণে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পদত্যাগের আগে আর্থিক সহায়তার তথ্য গোপন করার অভিযোগে ফ্যারাজের ওপর নজরদারি বাড়ছিল। এর মধ্যে ছিল ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায়ী ধনকুবের ক্রিস্টোফার হারবর্নের দেয়া ৫০ লাখ পাউন্ড (৬৬ লাখ ডলার) এবং প্রতারণার দায়ে দোষী সাব্যস্ত জর্জ কট্রেলের দেয়া অঘোষিত আর্থিক সহায়তা।
এমপিদের নির্বাচনের আগের এক বছর পর্যন্ত পাওয়া যেকোনো আর্থিক সহায়তার তথ্য প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।
তবে ফ্যারাজ দাবি করেছেন, হারবর্নের দেয়া অর্থ ছিল তার নিরাপত্তার জন্য উপহার। এমপি হওয়ার আগে ওই অর্থ দেয়া হয়েছিল বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন, ‘আমার কর্মকাণ্ডের বিচার ক্ল্যাকটনের জনগণই করবেন।’
কট্রেলের মা ফিওনা রিফর্ম ইউকেকে যে অনুদান দিয়েছেন, লন্ডন পুলিশ সেটিও তদন্ত করছে।
কৌতুকপ্রার্থী
কাউন্ট বিনফেস ব্রিটিশ নির্বাচনে ব্যঙ্গাত্মক প্রার্থী হওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ।
সংগীতশিল্পী ডেভিড সাচ ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করা ‘অফিশিয়াল মনস্টার রেভিং লুনি পার্টি’রও তিনজন প্রার্থী ক্ল্যাকটনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
দলের সদস্য ও প্রার্থী নিক দ্য ফ্লাইং ব্রিক বলেন, ‘সাধারণ মানুষ আসলে পছন্দ করে যে সাধারণত গম্ভীর রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে মঞ্চে কিছু হাস্যকর মানুষও থাকেন।’
বিনফেসের আসল পরিচয় অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা কৌতুকশিল্পী জন হার্ভে। তিনি ভোটারদের গণতন্ত্র রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি ওয়েবসাইটে লিখেছেন, ‘প্রতিটি প্রচারণার পেছনে একটি সহজ যুক্তি রয়েছে ভোট দিতে উপস্থিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। রাতের শেষটা কেমন হবে তা জানা থাকলেও ভোট দেয়া মূল্যবান।’
এরপর কী?
ফ্যারাজের পদত্যাগের কারণে তার আর্থিক বিষয় নিয়ে সংসদীয় তদন্ত স্থগিত রয়েছে। তবে তিনি পুনর্নির্বাচিত হলে সেপ্টেম্বরে সংসদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ শেষ হওয়ার পর তদন্ত আবার শুরু হবে বলে নিশ্চিতভাবেই ধারণা করা হচ্ছে।
লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক টিম বেল বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত এটি তাকে শুধু কিছুটা সময় দেবে।’
তিনি বলেন, ‘সম্ভবত তিনি আবার সংসদে ফিরবেন। কিন্তু তখন তদন্ত আবার শুরু হবে। তাই তিনি নির্বাচনে লড়তে পারেন, কিন্তু লুকিয়ে থাকতে পারবেন না।’
ফ্যারাজ গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়ে শাস্তির মুখে পড়লে আবারো উপ-নির্বাচন হতে পারে।
এদিকে, রিফর্ম ইউকের জনপ্রিয়তাও কমছে। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা গেছে, জাতীয় ভোটের হিসেবে লেবার আবার দলটিকে ছাড়িয়ে গেছে।
কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিটিশ রাজনীতির অধ্যাপক পিট ডোরি বলেন, ‘ক্ল্যাকটন খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এটি দেখিয়ে দিতে পারে যে নাইজেল ফ্যারাজ ও রিফর্ম ইউকে তাদের জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘তিনি যদি অল্প ব্যবধানে জয়ী হন অথবা ২০২৪ সালের নির্বাচনের তুলনায় অনেক কম ভোট পান, তাহলে এর অর্থ হবে তার জনপ্রিয়তা কমছে এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
সূত্র : বাসস


