মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার
- ৬টি মামলায় ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ৪৬ জনের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা
- মাহবুবউল আলম হানিফের মামলা রায়ের জন্য অপেমাণ
- ২ ট্রাইব্যুনালে ২৩টি মামলার বিচার চলছে
আলমগীর কবির
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বিগত সরকারের আমলের গুম ও গণহত্যার বিচারিক প্রক্রিয়ায় রায় ঘোষণার েেত্র বড় ধরনের অগ্রগতি হলেও বিচারিক ফলাফলের বড় একটি অংশজুড়ে রয়ে গেছে পলাতকদের ছায়া। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত ছয়টি স্পর্শকাতর মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫ আসামির ১১ জন এবং যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত ৪৬ জনের একটি বড় অংশই বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাগালের বাইরে।
ট্রাইব্যুনালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৭১টি মামলায় অভিযুক্ত মোট ৫০২ জন আসামির মধ্যে সর্বোচ্চ ৩১৫ জনই পলাতক রয়েছেন, যার বিপরীতে গ্রেফতার আছেন ১৮৪ জন। একদিকে যখন রায় ঘোষিত ছয়টি মামলার সাজাপ্রাপ্ত পলাতকদের দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকরের আইনি চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার হাতে এখনো ৩৫টি চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত কার্যক্রম পুরোদমে অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন ও নির্যাতনের মোট ৭১টি মামলা বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক এখতিয়ারে রয়েছে। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০২ জন। তবে আইনি প্রক্রিয়ায় আসামির এই সংখ্যা গণনার েেত্র বিশেষ কিছু হিসাব প্রয়োগ করা হয়েছে। নথিপত্র অনুযায়ী, ৫০২ জন আসামির তালিকায় একাধিক মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বারবার গণনায় এসেছেন। যেমন, মতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ছয়টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং একটিতে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার রায় এসেছে। ফলে একক ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনাকেই এই নথিতে সাতবার গণনা করা হয়েছে। তবে যে ছয়টি মামলার রায় চূড়ান্ত হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিতেই একই আসামিকে একাধিকবার গণনা করা হয়নি। ট্রাইব্যুনালের হালনাগাদ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অভিযুক্ত ৫০২ জন আসামির মধ্যে ৩১৫ জনই বর্তমানে বিভিন্ন দেশে বা আত্মগোপনে পলাতক রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন ১৮৪ জন আসামি। আসামিদের মধ্যে বিচার চলাকালে একজনকে আদালতের সার্বিক বিবেচনায় মা করা হয়েছে। এ ছাড়া একজন আসামি গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে রায় ঘোষণা পর্যন্ত সময়কালেই তার প্রাপ্য কারাদণ্ডের সাজা ভোগ সম্পন্ন করেছেন।
গঠন ও বিচারিক রূপরেখা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১০ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ল্য নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, ওই সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ পুনর্গঠন করে তৎকালীন সরকার। এর আগে ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় পুনর্গঠিত হয়। বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত ও সুসংহত করতে পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ৮ মে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হয়। বর্তমানে এই দু’টি ট্রাইব্যুনালেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, বিভিন্ন মেয়াদের গুম-খুন এবং ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত ছয়টি মামলার রায়ে দেখা যায়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫ জন আসামির মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ১১ জনই পলাতক, আর বাকি চারজন বর্তমানে কারাগারে বন্দী আছেন। আসামিদের মধ্যে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানকে পৃথক দু’টি মামলার (চানখাঁরপুল ও রামপুরা) রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৪৬ জনের মধ্যে ঢাকা রেঞ্জের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সৈয়দ নুরুল ইসলামসহ ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রথম রায়টি আসে গত বছরের ১৭ নভেম্বর। সেদিন জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-১ এবং রাজসাী (অ্যাপ্রুভার) হওয়ার কারণে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় রায়ে চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার অপরাধে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও সাবেক এডিসি শাহ্ আলম মো: আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। সাভারের আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনায় ৫ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত তৃতীয় রায়ে সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, সাবেক ওসি এ এফ এম সায়েদসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২।
জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ হত্যা মামলায় গত ৯ এপ্রিল ঘোষিত চতুর্থ রায়ে সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড এবং তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মো: হাসিবুর রশীদসহ ২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেয়া হয়। গত ২৮ জুন পঞ্চম রায়ে রামপুরার ঘটনার অপরাধে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক এডিসি মো: রাশেদুল ইসলাম ও সাবেক ওসি মো: মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। সর্বশেষ ৩০ জুন ঘোষিত ষষ্ঠ রায়ে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন আদালত।
বর্তমান বিচারিক স্থিতি অনুযায়ী, কুষ্টিয়ায় ছয় হত্যা মামলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজন পলাতকের বিরুদ্ধে মামলাটি ১০ জুন থেকে ট্রাইব্যুনাল-২-এ রায়ের জন্য অপেমাণ (সিএভি) রয়েছে। এ ছাড়া দু’টি ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ২৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যেখানে আসামি ৩১৬ জন। এসব মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব:) আজিজ আহমেদসহ ৩১ জন সামরিক কর্মকর্তা, হেভিওয়েট রাজনীতিক, সাংবাদিক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযুক্ত হিসেবে বিচারে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। বিচারাধীন ২৩টি মামলার মধ্যে ৯টিই আওয়ামী লীগ আমলের গুম ও নির্যাতনের ওপর গঠিত, যার মধ্যে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের গণহত্যা মামলা (আসামি ৪১ জন), র্যাবের টিএফআই সেলকেন্দ্রিক গুমের মামলা এবং ডিজিএফআইয়ের জেআইসি সেলের নির্যাতনের মামলা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তদন্তাধীন ৩৫টি মিস কেসের (বিবিধ মামলা) বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা যায়, এসব মামলায় এখনো ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়নি। তবে তদন্ত সংস্থা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কাজ করছে এবং ইতোমধ্যে সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন, সাবেক এডিসি ইশতিয়াক আহমেদ, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা তানভীর হাসান সৈকত এবং নারায়ণগঞ্জের সাবেক কমিশনার মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে খুব শিগগিরই এগুলো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আকারে ট্রাইব্যুনালে পেশ করা হবে।
এদিকে ট্রাইব্যুনালের দ্রুত বিচারকার্যক্রম এবং সার্বিক আইনগত অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম। তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, দেড় বছরেরও কম সময়ে একটি ট্রাইব্যুনাল সম্পূর্ণ বিচারিক নিয়ম মেনে ছয়-ছয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মামলার বিচার সম্পন্ন করেছে, যা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
পলাতক আসামিদের গ্রেফতার নিয়ে শহীদ পরিবারগুলোর আকুলতা ও ােভ প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট করে বলেন, কোনো আসামি হাতের কাছে থাকা সত্ত্বেও তাকে গ্রেফতার করা হয়নি এমন একটি নজিরও কেউ দিতে পারবে না। আসামি যখন দেশ ত্যাগ করে বা আত্মগোপনে চলে যায়, তখন আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তাকে ফেরাতে হয়, যা সরকার অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। রায় ঘোষণার েেত্র সাজা পার্থক্যের বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করে তিনি বলেন, অপরাধের ধরন ও আসামির মতার অপব্যবহারের দায়ভারের (প্রপোর্শনেট অব অফেন্স অ্যান্ড সেন্টেন্স) ওপর নির্ভর করে বিচারক সাজা নির্ধারণ করেন। আদালতের বিচারিক এখতিয়ারে শেখ হাসিনার ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ বা আদেশদাতার ভূমিকা এবং মাঠপর্যায়ের উপস্থিত আসামির অপরাধের আনুপাতিক দায় এক নয়। ফলে তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করেই বিচারকরা এই ন্যায়বিচারের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
অনুপস্থিত বা পলাতক আসামিদের সাজা কার্যকর ও নতুন মামলাগুলোর আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই বিশাল কাঠগড়ায় ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে এমনটাই প্রত্যাশা শহীদ পরিবারের সদস্য ও দেশের সাধারণ জনগণের।


