সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে বাস্তবের মিল নেই

Printed Edition
সচিবালয় ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম মিছিল নিয়ে পল্টনে আসলে পুলিশি বাধার মুখে সেখানেই অবস্থান নেয়:  নয়া দিগন্ত
সচিবালয় ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম মিছিল নিয়ে পল্টনে আসলে পুলিশি বাধার মুখে সেখানেই অবস্থান নেয়: নয়া দিগন্ত

বিশেষ প্রতিবেদক

জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক সম্পর্কিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে লান্তাবুর গ্রুপকে কথিত ৪০ কোটি টাকা অবৈধ সুবিধা প্রদান, পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (আরডিএস) মাধ্যমে ঋণ বিতরণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র দাবি করেছে, সংসদে উপস্থাপিত তথ্যের সাথে বাস্তবে কোনো মিল নেই, বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে অনুমাননির্ভর বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বক্তব্য দেয়া হয়েছে।

ব্যাংক সূত্র মতে, দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু অভিযোগ উত্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আর্থিক লেনদেন এবং ব্যাংকিং বিধিবিধান যাচাই না করলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। একই সাথে বিদেশী বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছেও নেতিবাচক বার্তা পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক : সংসদে ইসলামী ব্যাংকের পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প বা আরডিএস নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আরডিএসের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে, যার মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেয়া হয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকা। এ বিষয়ে ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য সম্পূর্ণ অনুমান নির্ভর ও অবাস্তব। সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে এবং এর কার্যক্রম সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৯৯৫ সালে চালু হওয়া এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ সুবিধার মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলা। প্রকল্পের আওতায় কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্যচাষসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে জামানতবিহীন বিনিয়োগ প্রদান করা হয়।

বর্তমানে একজন গ্রাহক সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ সুবিধা পান। সাধারণত এক বছরের মধ্যে সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তিতে এই অর্থ আদায় করা হয়। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির আওতায় মোট ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৫৯২ জন গ্রাহক রয়েছে। তাদের মধ্যে বিনিয়োগ স্থিতির পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রকল্পভুক্ত গ্রাহকদের সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রকল্পের আদায়ের হার ৯৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত সন্তোষজনক এবং কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রমাণ বলে মনে করা হয়।

বিতরণ ও আদায়ের চিত্র : ব্যাংকের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ বিতরণ করা হচ্ছে এবং তার বড় অংশই নিয়মিতভাবে আদায় হচ্ছে। ২০২৩ সালে প্রকল্পের আওতায় বিতরণ করা হয় ৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। একই সময়ে আদায় হয় প্রায় ৭ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। ২০২৪ গালে বিতরণ হয় ৬ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা এবং আদায় হয় ৬ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে বিতরণ করা হয় ৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা এবং আদায়ের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই ১ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা বিতরণ এবং ১ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে প্রকল্পটি আর্থিকভাবে টেকসই এবং এর কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় রয়েছে।

৪০ কোটি টাকার অভিযোগ। প্রকৃত ঘটনা কী? : সংসদে আলোচিত অন্যতম বিষয় ছিল লান্তাবুর গ্রুপকে ৪০ কোটি টাকা অবৈধ সুবিধা দেয়ার অভিযোগ। তবে ইসলামী ব্যাংক সূত্র বলছে, এই অভিযোগের ভিত্তি বাস্তব ঘটনার সাথে মেলে না। ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সময়ে ৪০ কোটি টাকার কোনো আর্থিক লেনদেনই সংঘটিত হয়নি। প্রকৃতপক্ষে ৪০টি পৃথক ফাইলের বিপরীতে মোট ৬ কোটি ৫০ লাখ ১৭ হাজার টাকার ক্যাশ ইনসেনটিভের ভিত্তিতে কর্জ হিসেবে অগ্রিম অর্থ প্রদান করা হয়েছিল। এই অর্থ মূলত বেতন পরিশোধ বা ‘স্যালারি পারপাস’-এর জন্য দেয়া হয়েছিল। ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ক্যাশ ইনসেনটিভ বা সরকারি প্রণোদনার বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি অগ্রিম অর্থায়ন দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি প্রচলিত ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্ট প্রণোদনার অর্থ সরকারি প্রক্রিয়ায় ছাড় হওয়ার পর সেই অর্থ থেকে অগ্রিম দেয়া অর্থ সমন্বয় করা হয়। লান্তাবুর গ্রুপের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রমের অংশ। বর্তমানে পুরো অর্থ যথাযথভাবে সমন্বয় হয়ে গেছে এবং ব্যাংকের কোনো আর্থিক ঝুঁকি বা ক্ষতির প্রশ্ন নেই।

বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ : লান্তাবুর গ্রুপের বিষয়ে ভুল তথ্য প্রচারের কারণে বিদেশী বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংক সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি একটি বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (ঝউও) প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে এবং আরো প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে কোনো বিদেশী বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে যাচাই-বাছাইহীন তথ্য প্রচারিত হলে তা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সংসদে উত্থাপিত বক্তব্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নয়, সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

নির্বাচনের আগে ঋণ বিতরণে অস্বাভাবিকতা? : ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আরডিএসের মাধ্যমে অস্বাভাবিক ঋণ বিতরণের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। তবে ইসলামী ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিষয়টি বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার মাসে মোট ২ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা বিনিয়োগ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নভেম্বরে ৪১৭ কোটি টাকা, ডিসেম্বরে ৬৯০ কোটি টাকা, জানুয়ারিতে ৫৩০ কোটি টাকা এবং ফেব্রুয়ারিতে ৫০৮ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। একই সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আদায়ও হয়েছে। ফলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অস্বাভাবিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঋণ বিতরণের অভিযোগ তথ্য-উপাত্ত দ্বারা সমর্থিত নয় বলে দাবি ব্যাংকের।

নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ : ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সাম্প্রতিক আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ। একটি অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ২০১৭ সালের পর থেকে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট জেলার প্রার্থীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি। এ বিষয়ে ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত না হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়োগসংক্রান্ত সব তথ্য যাচাইযোগ্য এবং প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে ব্যাখ্যা প্রদান করা হবে। তাদের মতে, নিয়োগের বিভিন্ন ধাপ পরিচালনা পর্ষদ, মানবসম্পদ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। ফলে কোনো অভিযোগ থাকলে তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা উচিত।

ব্যাংকিং খাতে প্রভাবের আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণ, তারল্য সঙ্কট, সুশাসনের অভাব এবং আস্থার সঙ্কটের মতো বিষয়গুলো নিয়ে জনগণের উদ্বেগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক সম্পর্কে যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য উপস্থাপন করা হলে তা আমানতকারী, বিনিয়োগকারী এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণ জরুরি। অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা উচিত, তবে অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। সার্বিকভাবে ইসলামী ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, সংসদে উত্থাপিত অভিযোগের বেশির ভাগই তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। ব্যাংকটির দাবি, প্রকৃত তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করলে বিষয়গুলোর বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হবে। একই সাথে তারা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল বক্তব্য প্রদান এবং তথ্য যাচাই করে মতামত দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।