নয়া দিগন্ত প্রতিবেদন
শিক্ষা প্রশাসনে কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা ও কনিষ্ঠতার (সিনিয়র-জুনিয়র) চিরাচরিত প্রশাসনিক প্রথা ও চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। দেশের পুরো শিক্ষা সেক্টরেই এখন কর্মকর্তা-শিক্ষকদের মধ্যে একধরনের চাপা ক্ষোভ আর হতাশার চিত্র দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে অপেক্ষাকৃত কনিষ্ঠদের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসানো হচ্ছে।
গত কয়েক দিনে শিক্ষা প্রশাসনে পদায়ন সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপনগুলোতে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ১৬তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও প্রভাব দেখে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন ১৪তম ব্যাচের জ্যেষ্ঠ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, বিসিএস ১৬তম ব্যাচের পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃস্থানীয় একজন কর্মকর্তা কৌশলে নীতিনির্ধারকদের কাছাকাছি থাকার সুযোগ নিয়ে এই বিতর্কিত পদায়নে মুখ্য ভূমিকা রাখছেন। শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এখন এই আলোচনাটিই প্রধান হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের (১৪ ব্যাচ) বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) দেবেন তাদের চেয়ে চার-পাঁচ বছরের জুনিয়র (১৬ ব্যাচের) কর্মকর্তারা, যা প্রশাসনিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে এখনো ১৪তম ব্যাচের শিক্ষা ক্যাডারের দেড় শতাধিক মেধাবী, দক্ষ এবং বিচক্ষণ কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন পদে কর্মরত রয়েছেন। তাদের অনেকেরই চাকরির মেয়াদকাল বা বয়স এখনো দুই থেকে আড়াই বছর বাকি আছে। তা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী পদে তাদেরকে দায়িত্ব না দিয়ে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র- তথা ১৬, ১৭ কিংবা ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। বিষয়টি শিক্ষা সেক্টরের সাধারণ কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের কাছে অত্যন্ত দৃষ্টিকটু এবং পক্ষপাতমূলক হিসেবে ধরা পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে শিক্ষা প্রশাসনে চেইন অব কমান্ড বা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।
গতকাল বুধবার শিক্ষা ক্যাডারের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সাথে আলাপকালে তারা জানান, শিক্ষা প্রশাসনের চিরাচরিত শৃঙ্খলা ও জ্যেষ্ঠতার নিয়ম এখন চরম সঙ্কটে। কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ আর হতাশা থাকলেও লোকলজ্জা আর নিজেদের আত্মমর্যাদার কথা চিন্তা করে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। যেসব শিক্ষক সারা জীবন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের নীতিকথা, সত্য ও ন্যায়ের অমিয় বাণী শিখিয়েছেন, কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তারা নিজেরাই চরম বৈষম্য আর অন্যায়ের শিকার হচ্ছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এটিকে অনেকে ‘বেঁচে থেকেও মরে যাওয়ার শামিল’ বলে মন্তব্য করেছেন।
সুনির্দিষ্ট কিছু বিতর্কিত পদায়নের চিত্র
অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদ থেকে ১৪তম ব্যাচের অত্যন্ত মেধাবী ও চৌকস কর্মকর্তা প্রফেসর ড. খন্দকার এহসানুল কবিরকে সরিয়ে সেখানে পদায়ন করা হয়েছে ১৬তম ব্যাচের কর্মকর্তা অধ্যাপক সৈয়দ আক্তাররুজ্জামানকে। এই পদায়নের পর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যেই চরম ক্ষোভের তৈরি হয়েছে এবং অনেকেই প্রকাশ্যেই এর সমালোচনা করছেন।
অনুরূপভাবে, যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের পদ থেকে ১৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা মোসাম্মদ আসমা বেগমকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে নিয়োগ দেয়া হয়েছে অধ্যাপক ফারুখে আযম মু. আব্দুস ছালামকে। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে অধ্যাপক খন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমানকে, তিনিও ১৬তম ব্যাচের কর্মকর্তা। অথচ এই পদে এর আগে দায়িত্ব পালন করছিলেন ১৪তম ব্যাচের অধ্যাপক মিঞা মো: নুরুল হক, তাকেও ওই পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, জ্যেষ্ঠদের ডিঙিয়ে এভাবে নিচের ব্যাচের বা জুনিয়র কর্মকর্তাদের শীর্ষ পদে বসানোর প্রক্রিয়াটি মূলত শুরু হয় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক (ডিজি) পদে প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের পদায়নের পর থেকে। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, মাউশির বর্তমান ডিজি নিজের অবস্থান ও পদায়নকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিকভাবে সুরক্ষিত রাখতেই একের পর এক জুনিয়র কর্মকর্তাদের এনে সিনিয়রদের পদে বসাচ্ছেন। খোদ মাউশি বা অধিদফতরেই ১৪তম ব্যাচের অন্তত অর্ধ ডজন কর্মকর্তাকে গত তিন মাসে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাউশির সাবেক ডিজি অধ্যাপক ড. আযাদ খান, প্রফেসর বি এম আব্দুল হান্নান এবং ডিআইএ-এর (শিক্ষা অডিট) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক কাজী মো: আবু কাইয়ুম শিশিরসহ আরো কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়েছেন।
বিভিন্ন সংস্থায় ১৬ ও ১৮ ব্যাচের আধিপত্য : প্রশাসনিক সূত্র জানায়, বর্তমানে মাউশির কলেজ ও প্রশাসন শাখার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিচালকের দায়িত্বে আছেন অধ্যাপক নাজমুল, যিনি ১৬তম বিসিএস শিক্ষা ব্যাচের কর্মকর্তা। এই অধিদফতরের অর্থ ও ক্রয় উইংয়ের পরিচালক মনির হোসেন পাটওয়ারী এবং প্রশিক্ষণ উইংয়ের পরিচালক আনোয়ার হোসেন- উভয়েই একই ব্যাচের (১৬তম) কর্মকর্তা।
একই চিত্র দেখা গেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডেও (এনসিটিবি)। সেখানে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ ও ১৬তম ব্যাচের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন ১৬তম ব্যাচের প্রফেসর ড. শামীম আরা চৌধুরী। সেখানে কর্মরত আগের চেয়ারম্যান ১৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা প্রফেসর আ ন ম মোফাখখারুল ইসলামকে সরিয়ে এই জুনিয়র কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একইভাবে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে আরো এক ধাপ এগিয়ে অপেক্ষাকৃত অনেক জুনিয়র, অর্থাৎ ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো: আহসান পারভেজকে চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। অথচ ঢাকা ও ঢাকার বাইরে মাঠপর্যায়ে ১৪তম ব্যাচের বহু দক্ষ, অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এখনো উপেক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন।
বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগ
মাউশির একাধিক সূত্র দাবি করেছে, শিক্ষা প্রশাসনে হঠাৎ ‘ভাগ্যবান’ হয়ে ওঠা এই ১৬তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন দফতরপ্রধান হিসেবে জড়ো করার পেছনে মূল ভূমিকা রাখছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের একান্ত সচিবের (পিএস) পদ থেকে একসময় পদত্যাগ করা ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। মাত্র কিছুদিন আগেই নানা নাটকীয়তা ও প্রশাসনিক তদবিরের শেষে প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল মাউশির ডিজি পদটি লাভ করেন। অভিযোগ রয়েছে, ডিজি পদে আসীন হওয়ার পর থেকেই শিক্ষার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন কিংবা বদলির তদবির নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তার যাতায়াত ও প্রভাব বহু গুণ বেড়েছে।
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, মাউশির ডিজি যখনই মন্ত্রণালয়ে আসেন, তার সাথে কোনো না কোনো তদবির বা বিশেষ সুপারিশের ফাইল থাকে। অধিদফতরের রুটিন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজের চেয়ে ডিজির দফতরে বদলি বা পদায়নের ফাইলই বেশি গুরুত্ব পায় বলে অভিযোগ। শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে এখন নতুন ও নেতিবাচক এক স্লোগান চালু হয়েছে- ‘পদ পাইতেও টাকা, আবার পদে থাকতেও লাগবে টাকা’। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এভাবে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং অনিয়ম চলতে থাকলে বর্তমান ক্লিন ইমেজের শিক্ষামন্ত্রীর সুনাম ক্ষুণœ হতে পারে। এমনকি পদায়ন নিয়ে এ ধরনের গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের কারণে শিক্ষামন্ত্রী রাজনৈতিকভাবে তীব্র চাপে পড়তে পারেন এবং তার নিজের মন্ত্রিত্ব বা পদও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, শিক্ষামন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘদিনের পরিচিত হওয়ার সুবাদে মাউশির ডিজি নিজের ইচ্ছামতো গোটা শিক্ষা প্রশাসন সাজাচ্ছেন। ১৬তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের এই কর্মকর্তার একচ্ছত্র প্রভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন ১৪তম ব্যাচের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। আর গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী পদগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে তার নিজস্ব ব্যাচমেটদের (১৬ ব্যাচ) হাতে। মাউশি, এনসিটিবি, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড কিংবা নায়েম- সব শীর্ষ পদেই এখন ১৬ ব্যাচের একচ্ছত্র আধিপত্য। ফলে জ্যেষ্ঠতা বা মেধার চেয়ে ব্যক্তিবিশেষের অনুগত বা নজরে আসাই এখন পদায়নের বড় যোগ্যতা হয়ে উঠেছে।
মাউশি মহাপরিচালকের বক্তব্য : এসব অভিযোগের বিষয়ে গতকাল মাউশির মহাপরিচালক (ডিজি) প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়গুলোকে স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দাবি করেন। তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, সিনিয়রদের ডিঙিয়ে জুনিয়রদের পদায়নের ঘটনা এবারই শিক্ষা প্রশাসনে প্রথম বা নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও অনেক নিয়ম ও প্রথা ভেঙে এভাবেই পদায়ন করা হয়েছিল।
বর্তমান পদায়নগুলোর সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন যাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হচ্ছে, তাদের অধিকাংশই বিগত দিনে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তা ছিলেন। সুতরাং এখন তারা কিছুটা মূল্যায়ন বা সুবিধা পাবেন- এটাই স্বাভাবিক। এতে বিতর্ক তৈরি করার কিছু নেই।’
জুনিয়রদের অধীনে সিনিয়রদের এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) দেয়ার প্রশাসনিক জটিলতার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিজি বলেন, এই প্রথাটিও শিক্ষা সেক্টরে নতুন নয়। অতীতে এমনও নজির রয়েছে যেখানে ১৪তম ব্যাচের কোনো কোনো কর্মকর্তা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পজিশন ও দায়িত্বের কারণে সপ্তম ব্যাচের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদেরও এসিআর লিখেছেন। ফলে বর্তমান পদায়নে প্রশাসনিক নিয়ম বা বিধির কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না বলে তিনি দাবি করেন।



