নিয়মের মধ্যে থাকলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ মনে করেন, গুটিকয়েক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে গোটা সেক্টরকে দায়ী করা ঠিক হবে না। প্রতি বছরই ইউজিসি থেকে আইনের ব্যত্যয় ঘটানো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে ভর্র্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদেরও সতর্ক করা হচ্ছে। দৈনিক নয়া দিগন্তকে তিনি আরো জানান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনেও বেশ কিছু নতুন বিধিবিধান পরিমার্জন বা যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আশা করা হচ্ছে কঠোর নীতি আর নিয়মের মধ্য নিয়ে আসতে পারলে জনগণের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে তা দূর করা সম্ভব হবে।
যদিও দীর্ঘ দিন ধরে দেশের বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে স্থায়ী ক্যাম্পাসে না যাওয়া, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, আর্থিক অনিয়ম, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি এবং আইনবহির্ভূতভাবে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও আসছে হরহামেশাই। এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) একাধিক কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউজিসি ইদানীং আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ইউজিসির তদন্ত রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষাকার্যক্রম স্থানান্তর না করা, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি, প্রশাসনিক কাঠামো লঙ্ঘন এবং একাধিক পদে একই ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের মতো অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইউজিসি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াও শুরু করেছে।
সূত্র মতে, আনীত নানা অভিযোগের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের বিষয়টি ইউজিসি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করছে। ২০২৩ সালে কমিশন ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়কে চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছিল। এরপর কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে গেলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে ভর্তি সীমিত করা, নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করা কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার বিষয় বিবেচনায় রয়েছে। অন্য দিকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ইউজিসির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রপতির নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি, প্রোভিসি বা কোষাধ্যক্ষ নেই। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইউজিসির মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুশাসন নিশ্চিত করতে এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়মিত নিয়োগ অপরিহার্য।
শুধু প্রশাসনিক তদারকি নয়, আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেও নতুন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে কমিশন প্রয়োজন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব তলব করতে পারবে, সরেজমিন পরিদর্শন করতে পারবে এবং অনিয়মের অভিযোগ পেলে স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্তও করতে পারবে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নির্দেশনা না মানলে কোর্স অনুমোদন স্থগিত, ভর্তি বন্ধ কিংবা অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতাও থাকবে। এদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এর নির্দিষ্ট কয়েকটি ধারার প্রস্তাবিত সংশোধনীতে আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তি আরো কঠোর করার সুপারিশ করা হয়েছে। খসড়ায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এমন কঠোর শাস্তির বিধান অনিয়ম কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিলেই হবে না; বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মান, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। এ কারণে ইউজিসির সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত অডিট, র্যাংকিং প্রকাশ, প্রশাসনিক মূল্যায়ন এবং অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা বাড়লে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতে স্বচ্ছতা ও শিক্ষার মান উন্নত হবে। সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে ইউজিসি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। স্থায়ী ক্যাম্পাস, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে চলমান উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতোমধ্যে ইউজিসি থেকে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদেরও সতর্ক করতে ত্বরিত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমে তারা ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে ইউজিসি নিয়মিতভাবে এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করছে যেখানে প্রশাসনিক জটিলতা, ট্রাস্টি বোর্ডের বিরোধ, স্থায়ী ক্যাম্পাসের অভাব বা আইনগত সমস্যা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে ডিগ্রির স্বীকৃতি ও অন্যান্য জটিলতায় পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হচ্ছে। একইসাথে এমন ঝঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হওয়ার জন্যও পরামর্শ ও সতর্ক করা হচ্ছে। ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের নিয়মিতভাবে ইউজিসির অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা, অনুমোদিত প্রোগ্রাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা ওয়েবসাইট থেকে যাচাই করতে বলা হচ্ছে। আবার সময়ে সময়ে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনহীন ক্যাম্পাস বা কোর্স পরিচালনা করছে তাদের তালিকাও প্রকাশ করে সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছে। একইভাবে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করা হয়েছে বা সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করছে ইউজিসি। এতে শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারছে।



