নিজস্ব প্রতিবেদক
টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই সেল) গুম করে রেখে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চাঞ্চল্যকর জবানবন্দী দিয়েছেন ভুক্তভোগী ডা: আশিক উল আকবর (৩১)। গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদের একক বেঞ্চে এ স্যা গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। স্যা গ্রহণ শেষে আসামিপরে আইনজীবীরা তাকে দীর্ঘ জেরা করেন। জবানবন্দীতে ভুক্তভোগী চিকিৎসক ২০১৬ সালে গাজীপুরের টঙ্গী থেকে তাকে তুলে নিয়ে দীর্ঘ ৬০ দিন চোখ-হাত বেঁধে গোপন বন্দিশালায় রাখা, ইলেকট্রিক শক দেয়া, ডান চোখের রেটিনা ছিঁড়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে মিথ্যা জঙ্গি মামলায় ফাঁসানোর বিবরণ তুলে ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে র্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা এ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১০ জন বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা বর্তমানে ঢাকা সেনানিবাসের বিশেষ কারাগারে (সাবজেল) বন্দী আছেন। গতকাল কড়া নিরাপত্তা ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে তাদের ট্রাইব্যুনালে এনে এজলাসে হাজির করা হয়।
আদালতে হাজির করা আসামিরা হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো: কামরুল হাসান, মো: মাহাবুব আলম, কে এম আজাদ; এলপিআরে থাকা কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও আনোয়ার লতিফ খান এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম ও মো: সারওয়ার বিন কাশেম। অন্য দিকে মামলার অপর সাত আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন। তারা হলেন মতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক (পরে আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, এম খুরশীদ হোসেন, মো: হারুন অর রশিদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল অব: মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম।
আদালতে স্যা দিতে গিয়ে রংপুর প্রাইম মেডিক্যাল কলেজ থেকে ২০২৩ সালে এমবিবিএস পাস করা ডা: আশিক উল আকবর জানান, তিনি মুক্তিযোদ্ধা খলিলুর রহমানের সন্তান। ২০১৬ সালে তিনি মেডিক্যাল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিার্থী ছিলেন এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। সে সাথে তৎকালীন সরকারবিরোধী আন্দোলন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ করতেন। ২০১৬ সালের ২৩ মে রাত আনুমানিক ৩টায় গাজীপুরের টঙ্গীতে মামার বাড়ি থেকে ১০-১২ জন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে এবং তাকে মারধর করতে করতে তুলে নিয়ে যায়। গাড়িতে তোলার পরপরই চোখ শক্ত করে বেঁধে মাথায় জমটুপি পরিয়ে দেয়া হয়। দীর্ঘ পথ অতিক্রমের পর তাকে একটি অজানা গোপন বন্দিশালায় রাখা হয়, যেখানে সার্বণিক বিমান ও ট্রেনের শব্দ পাওয়া যেত। সেখানে দীর্ঘ ৬০ দিন তাকে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়। দিনরাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র দুইবার তিন মিনিটের জন্য গোসল ও টয়লেটের সুযোগ দেয়া হতো এবং সামান্য দেরি হলেই চলত নির্মম শারীরিক নির্যাতন।
জবানবন্দীতে সাী আরো বলেন, গুম থাকা অবস্থায় জঙ্গি সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ে তাকে মেশিনের সাহায্যে ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে কানের লতিতে ইলেকট্রিক শক দেয়া হলে তিনি সংজ্ঞাহীন হওয়ার উপক্রম হন; জবানবন্দীর এ পর্যায়ে সাী ট্রাইব্যুনালে আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। চোখ অত্যধিক শক্ত করে বাঁধার কারণে তার ডান চোখের রেটিনা ছিঁড়ে যায়, যা পরবর্তীতে জামিনে মুক্তির পর অস্ত্রোপচার করতে হয়। দীর্ঘ ৬০ দিন গুম রাখার পর ২০১৬ সালের ২১ জুলাই তাকেসহ অন্য তিনজনকে র্যাব-১ এর মিডিয়া সেন্টারে নেয়া হয়। সেখানে টেবিলের ওপর নাট-বল্টু দিয়ে অস্ত্র ও বিস্ফোরক সাজিয়ে নাটকীয়ভাবে ছবি তুলে মিডিয়াতে প্রচার করা হয় এবং টঙ্গী থানায় তিনটি মিথ্যা জঙ্গি মামলা দেয়া হয়। টঙ্গী থানার তৎকালীন ওসি প্রথমে গুমের শিকার মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে মিথ্যা মামলা দিতে আপত্তি জানালেও ওপরের টেলিফোন কলে মামলা গ্রহণে বাধ্য হন। কেবল তাই নয়, আশিক উল আকবরের বাবা তার ছেলেকে উদ্ধারে জয়দেবপুর থানায় যে অপহরণ মামলা করেছিলেন, সেটি প্রত্যাহার করাতে পরবর্তীতে তাকে আরো বেশ কয়েকটি থানায় মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে এনে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। দীর্ঘ দুই মাস গুম ও ১৩ মাস কারাগারে থাকার পর তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্ত হন এবং পরবর্তীতে আদালত থেকে এসব মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতির আদেশ পান।
সাীর জবানবন্দী শেষ হলে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আসামি কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কেএম আজাদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহাবুব আলম, কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মোমেন এবং লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমনের পে জেরা পরিচালনা করেন বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো: শাহীনুর ইসলাম। জেরার সময় আসামি প থেকে জানতে চাওয়া হয়, ঘটনার সময় তার বাবা জয়দেবপুর থানায় ১০-১২ জন অজ্ঞাত অস্ত্রধারীর বিরুদ্ধে যে অপহরণ মামলা করেছিলেন, তাতে সুনির্দিষ্ট কোনো বাহিনীর নাম ছিল কি না। জবাবে সাী জানান, সেখানে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের নাম উল্লেখ ছিল। জেরা চলাকালে আসামিপরে আইনজীবী দাবি করেন, টঙ্গী থানার মামলাগুলোতে নিরপে সাী ছিল এবং সে সময় আসামি আদালতে গুম ও নির্যাতনের বিষয়ে কোনো দরখাস্ত দেয়নি। এর জবাবে সাী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ট্রাইব্যুনালকে জানান যে, তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতির ভয়াবহতার কারণে তাদের পে আদালতে নির্যাতনের বিরুদ্ধে দরখাস্ত দেয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ ছিল না। একই সাথে তিনি আসামি পরে আইনজীবীর এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেন যে, তিনি আদালতে অসত্য তথ্য উপস্থাপন করেছেন। জেরা শেষ হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের তারিখ নির্ধারণ করেন।


