পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির আমেজ কাটতেই মাঠের রাজনীতিতে বড় ধরনের কৌশলী পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশের পর থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত এই রাজনৈতিক শক্তির কার্যক্রম মূলত আলোচনা সভা, সেমিনার, সংবাদ সম্মেলন ও দলীয় কার্যালয়কেন্দ্রিক ঘরোয়া গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ঈদ-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক সঙ্কট এবং রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক দাবিগুলোকে সামনে রেখে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। ‘ইনডোর রাজনীতির’ খোলস ছেড়ে জনগণের বাস্তব সমস্যার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নিজেদের একটি শক্তিশালী বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই এখন দলটির প্রধান লক্ষ্য।
এনসিপির দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ নেতারা বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের হারিয়ে যাওয়া এবং সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল ও ভূমিকা নিয়ে মানুষ ক্ষুব্ধ হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যমপন্থী নতুন দল হিসেবে এনসিপির বিকল্প শক্তি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে দলকে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত শক্তিশালী ও বিস্তৃত করা গেলে আন্দোলন-সংগ্রাম এবং আগামী নির্বাচনে ভালো করা সম্ভব। সেজন্য বিভিন্ন দল, সংগঠন, প্লাটফর্মের নেতা ও ব্যক্তিত্বকে যুক্ত করার কৌশল নেয়া হয়, যা সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, জুলাই শক্তিগুলোর ঐক্য প্রক্রিয়া চলছে। এ প্রক্রিয়া একটি পর্যায়ে গেলে সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা হবে। এনসিপির পারফরম্যান্সে মানুষের মধ্যে আশা-আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য দলকে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত শক্তিশালী করা। সাংগঠনিক কাঠামো বিস্তৃত করা।
জনসম্পৃক্ত ইস্যু ও আন্দোলনের রূপরেখা
এনসিপির মাঠপর্যায়ের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হবে জনগণের নিত্যদিনের দুর্ভোগ। দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, বর্তমানে দেশের সবচেয়ে জরুরি তিনটি জনস্বার্থের ইস্যু হলো- দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, তীব্র জ্বালানি সঙ্কট ও নাগরিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক হয়রানি। এর পাশাপাশি শ্রমজীবী ও পেশাজীবী মানুষের অধিকার রক্ষা এবং স্থানীয় প্রশাসনের অনিয়মকে সামনে রেখে মাঠমুখী কর্মসূচির রূপরেখা তৈরি করছে এনসিপি।
এনসিপির একাধিক নেতা জানান, এ যাবতকালে দলটিকে ‘ঘরোয়া রাজনীতির’ জন্য যে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে এখন মাঠের কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। দলটির সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ধারাবাহিক পথসভা, গণসংযোগ, বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও নাগরিক সমাবেশ। এনসিপির নেতাদের মূল্যায়ন, বর্তমান জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দলগুলো জনগণের দৈনন্দিন সঙ্কট নিয়ে প্রত্যাশিত মাত্রায় সোচ্চার হতে পারেনি এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এই রাজনৈতিক শূন্যতাকেই সুযোগ হিসেবে দেখছে এনসিপি। তারা আন্দোলনের পাশাপাশি জনগণের নিত্যদিনের সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে ‘ভয়েস রেইজ’ বা আওয়াজ তুলে অন্যান্য দলের চেয়ে নিজেদের অবস্থানকে ভিন্ন ও অধিকতর। গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে চায়।
শুধু জনজীবনের সঙ্কটই নয়, রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের দাবিতেও সোচ্চার হচ্ছে দলটি। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করা না হলে সংসদ ও রাজপথ-উভয় ক্ষেত্রেই সরকারের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করা হবে।
আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান গত ২৯ এপ্রিল সংসদে সংবিধান সংশোধনের জন্য যে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন, এনসিপি তাতে অংশ না নেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলটির একজন নীতিনির্ধারক ও সংসদ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছেন যে তারা এই কমিটিতে যাচ্ছেন না। এনসিপির যুক্তি হলো- সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করলে তা কেবল একটি সীমিত পরিবর্তন নিয়ে আসবে। কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বাধীন বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গণভোটভিত্তিক সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।
এনসিপি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সরকার যদি এই সংস্কারের বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না দেখায়, তবে ঈদের পর রাজপথে আরো কঠোর ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও সাংগঠনিক বিস্তার
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখেই মূলত এনসিপি তাদের এই মাঠমুখী কৌশল সাজিয়েছে। দলটির ধারণা, জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে জনভিত্তি গড়ে তোলা আবশ্যক। আর সেই ভিত্তি তৈরির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে সরাসরি আন্দোলন করা। অর্থাৎ, আন্দোলন ও নির্বাচনী রাজনীতির মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষা করতে চাইছে তারা।
সাংগঠনিক বিস্তারের অংশ হিসেবে এরই মধ্যেই এনসিপি গত ২৯ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে এবং ১০ মে দেশের ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় নির্বাচনের জন্য দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নতুন কমিটি গঠন, রাজনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ পুরোদমে চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সারোয়ার জাহানের মতে, ঈদের পর মাঠে সক্রিয় হওয়ার এই সিদ্ধান্ত এনসিপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা নতুন অধ্যায় হতে পারে।
দল সম্প্রসারণ ও বহিষ্কৃত নেতাদের অন্তর্ভুক্তি
মাঠের রাজনীতি ও নির্বাচনকে সফল করতে এনসিপি তাদের দল সম্প্রসারণের কৌশল অব্যাহত রেখেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসন্তুষ্ট ও বহিষ্কৃত নেতাদের নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করছে তারা। এর অংশ হিসেবে গত এপ্রিলে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার এবং জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী কোনো ধরনের অপরাধ বা দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন না, তাদেরও দলে নেয়ার বিষয়ে দলের ভেতরে ইতিবাচক আলোচনা চলছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যজোটের অংশ হিসেবে ৩০টি আসনে লড়াই করে ছয়টিতে জয় পেয়েছিল এনসিপি। তবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এই জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট ধোঁয়াশা ও টানাপড়েন তৈরি হয়েছে।
এই জোটের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আরিফুল ইসলাম জানান, ১১-দলীয় ঐক্য ছিল মূলত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কার কেন্দ্রিক একটি জোট। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা আপাতত নিজেদের মতো করে এককভাবেই এগোচ্ছেন। এনসিপির শীর্ষস্থানীয় আরেকজন নেতার মতে, স্থানীয় পর্যায়ে তারা কোনো জোট করেননি, ফলে জামায়াতসহ ১১-দলীয় ঐক্যের শরিকদের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে মাঠের আন্দোলন চললেও, স্থানীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র অবস্থান জোরালো করাই তাদের বর্তমান লক্ষ্য।
এ বাস্তবতায় আগামী ছয় মাসের মধ্যে এনসিপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো- নিজেদের একটি একক, স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাঠে প্রতিষ্ঠা করা এবং জোটের অভ্যন্তরীণ চাপ কাটিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট করা।



