বিদ্যুৎসঙ্কটে ২০২৭ সালের পাঠ্যবই মুদ্রণে নতুন শঙ্কা

প্রেসপাড়ায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চিঠি

Printed Edition

শাহেদ মতিউর রহমান

দেশব্যাপী অব্যাহত বিদ্যুৎসঙ্কটে এবার ২০২৭ শিাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজে তীব্র সঙ্কটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও নতুন বছরের পাঠ্যবই মুদ্রণের সামগ্রিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে; কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা এই সেক্টরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ছাপাখানাগুলোতে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ ঘাটতির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে বছরের শেষ দিকে পাঠ্যবই ছাপার কাজে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় শিাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এরইমধ্যে ২০২৭ শিাবর্ষের বই মুদ্রণের জন্য দরপত্র আহ্বান ও বাছাই প্রক্রিয়াও শেষ করেছে। গত ৩ জুন প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণীর বই এবং জুনের প্রথম সপ্তাহে মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর বই মুদ্রণের দরপত্র প্রকাশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে অষ্টম শ্রেণীসহ অন্যান্য স্তরের বইয়ের জন্যও দরপত্র দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগামী শিাবর্ষের বই ছাপার প্রস্তুতি এখনই চলছে।

এনসিটিবি সূত্র গতকাল বৃহস্পতিবার নয়া দিগন্তকে জানায়, সম্প্রতি প্রাক প্রাথমিক ও প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত নতুন পাঠ্যবই এবং মাধ্যমিকের অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্যবই মুদ্রণের প্রেসগুলোর মূল্যায়ন ও যাচাই-বাছাই করে মূল্যায়ন কমিটির রিপোর্টও মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। আগামী ১৬ আগস্ট রোববার নবম শ্রেণীর মূল্যায়ন কমিটির রিপোর্ট জমা দেয়া হবে। এরপর মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের পরেই প্রেসগুলো তাদের ছাপার কাজ শুরু করবে। কিন্তু দেশব্যাপী অব্যাহত লোডশেডিংয়ের কারণে প্রেস মালিকদের পক্ষ থেকেও বিদ্যুতের সরবরাহ অব্যাহত রাখার বিষয়ে চিঠি দিয়ে এনসিটিবিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।

বিদ্যুৎ ঘাটতিই বড় ঝুঁকি : প্রেস মালিকরা জানান, ছাপাখানার উৎপাদন পুরোপুরি বিদ্যুৎনির্ভর। কাগজ কাটিং, অফসেট প্রিন্টিং, ভাঁজ, বাঁধাই ও প্যাকেজিং প্রায় প্রতিটি ধাপেই বিদ্যুৎ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ চলে গেলে শুধু মেশিন বন্ধ হয় না, শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং একটি কাজের পুরো উৎপাদনসূচি পিছিয়ে যায়। ২০২৬ সালের জুনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও কোথাও দিনে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। পাঠ্যবই ছাপার েেত্র এ পরিস্থিতি আরো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বছরের শেষ তিন মাসে একসাথে বিপুলসংখ্যক বই ছাপা, বাঁধাই ও সরবরাহ করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদন শেষ করতে হলে ছাপাখানাগুলোকে প্রায় বিরতিহীনভাবে মেশিন চালাতে হয়।

অতীতের বিদ্যুৎসঙ্কটের অভিজ্ঞতা : বিদ্যুৎসঙ্কটের সাথে পাঠ্যবই মুদ্রণের সমস্যা নতুন নয়। ২০২২ শিাবর্ষের বই ছাপার সময়ও বিদ্যুৎসঙ্কট, কাগজের উচ্চমূল্য ও কাজের আদেশ দিতে দেরিকে বই মুদ্রণে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সে সময় এনসিটিবি জানিয়েছিল, বিদ্যুৎসঙ্কট ও কাগজের অপ্রতুলতার কারণে বই ছাপার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ২০২২ সালের শেষ দিকে প্রাথমিকের প্রায় ১০ কোটি এবং মাধ্যমিকের প্রায় ২৪ কোটি বই ছাপার প্রক্রিয়া চলছিল। বিদ্যুৎ ও কাগজের সঙ্কটের কারণে নির্ধারিত সময়ে সব বই প্রস্তুত করা নিয়ে তখনই শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে কাগজ সঙ্কটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ-জ্বালানি ঘাটতি, দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ও অন্যান্য সমস্যাকে বই মুদ্রণে দেরির কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।

২০২৭ সালের ঝুঁকি আরো বেশি : ২০২৭ সালের বই মুদ্রণের েেত্র শুধু বিদ্যুৎ নয়, একাধিক বিষয় একসাথে চাপ তৈরি করতে পারে। ২০২৫ সালের বই মুদ্রণের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পুনঃদরপত্র, কাগজের সরবরাহ সমস্যা, ছাপাখানার ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং দুর্বল সমন্বয়ের কারণে নির্ধারিত সময়ে বই ছাপা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে প্রায় ৪০ কোটি বই ছাপার পরিকল্পনা নিয়েও ব্যাপক বিলম্ব হয়েছিল। ২০২৬ শিাবর্ষেও মাধ্যমিকের বইয়ের একটি বড় অংশ বছরের প্রথম দিনে শিার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে মাধ্যমিকের ২১ কোটি ৪৩ লাখ বইয়ের মাত্র প্রায় ৫৯ শতাংশ স্কুলে পৌঁছেছিল। ছাপাখানাগুলোর কাজের অসম বণ্টন, দুর্বল তদারকি, কাগজসংক্রান্ত সমস্যা এবং দরপত্র বাতিল ও পুনঃদরপত্রকে এর অন্যতম কারণ বলা হয়েছিল। এবারো যদি একই সময়ে বিদ্যুৎসঙ্কট দেখা দেয়, তাহলে উৎপাদনের দৈনিক সমতা কমে যেতে পারে। ফলে মুদ্রণ শেষ হওয়ার পরও বাঁধাই, মান যাচাই ও পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় কমে যাবে।

জেনারেটর দিয়ে কতটা সামাল দেয়া সম্ভব : বিদ্যুৎ না থাকলে বড় ছাপাখানাগুলো জেনারেটর ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালালে ডিজেলের ব্যয় বাড়ে। এতে বই মুদ্রণের খরচও বেড়ে যায়। আবার সব ছাপাখানার নিজস্ব শক্তিশালী জেনারেটর নেই। ফলে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ২০২৬ সালের বিদ্যুৎসঙ্কটের সময় শিল্পকারখানাগুলোকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে বাড়তি ব্যয় করতে হয়েছে এমন চিত্র এরইমধ্যে দেখা গেছে।

ছাপাখানার সমতা নিয়েও প্রশ্ন : শুধু বিদ্যুৎ থাকলেই যে সঙ্কট হবে না এমন নয়, অতীতের অভিজ্ঞতা তার প্রমাণ। ২০২৫ সালের বই মুদ্রণের সময় একটি বড় অংশের কাজ অল্পসংখ্যক ছাপাখানায় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছিল। ফলে অতিরিক্ত কাজের চাপ সামলাতে গিয়ে সময়মতো বই সরবরাহে সমস্যা হয়। তাই ২০২৭ সালের জন্য শুধু দরপত্র দেয়াই যথেষ্ট নয়। কোনো ছাপাখানার দৈনিক উৎপাদন সমতা কত, তাদের নিজস্ব জেনারেটর আছে কি না, কাগজ ও কালির মজুদ কত এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে বিকল্প ব্যবস্থা কীÑ এসব তথ্য আগেই যাচাই করা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত ভোগান্তিতে শিার্থীরাই : বই মুদ্রণে সামান্য দেরিও শেষ পর্যন্ত শিার্থীদের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বই না পাওয়ায় অনেক শিার্থী পুরনো বই, ফটোকপি কিংবা পিডিএফের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছে। ২০২৫ সালে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ৪০ কোটি ১৫ লাখ বইয়ের ৬৩ শতাংশই স্কুলে পৌঁছায়নি। এ অবস্থায় ২০২৭ সালে বিদ্যুৎসঙ্কটকে সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে এখনই বিবেচনায় না নিলে বছরের শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে।

আগাম প্রস্তুতির তাগিদ : শিা-সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৭ সালের বই মুদ্রণকে ‘জানুয়ারির বই’ হিসেবে না দেখে অন্তত ছয় মাসের উৎপাদন পরিকল্পনা হিসেবে নিতে হবে। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় করে গুরুত্বপূর্ণ ছাপাখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা, বিকল্প জেনারেটর প্রস্তুত রাখা, ছাপাখানার মধ্যে কাজের ভারসাম্য তৈরি এবং দৈনিক উৎপাদনের তথ্য এনসিটিবির কেন্দ্রীয় পর্যবেণে আনা প্রয়োজন। এনসিটিবির বর্তমান দরপত্র কার্যক্রম দেখে বোঝা যায়, ২০২৭ সালের বই মুদ্রণের প্রস্তুতি সময়মতো শুরু হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে। আগের বছরের মতো কাগজ, দরপত্র ও ছাপাখানার সমতার সাথে যদি বিদ্যুৎসঙ্কটও যুক্ত হয়, তাহলে নতুন বছরের প্রথম দিনেই সব শিার্থীর হাতে বই পৌঁছে দেয়া আবারো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বিদ্যুৎসঙ্কট এবং এনসিটিবির প্রস্তুতির বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা এই প্রতিবেদককে জানান, বিদ্যুৎসঙ্কটের বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং আমরা এনসিটিবি কিছু আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। যেমন যেমন এলাকায় প্রেসগুলোর অবস্থান বেশি সেসব এলাকায় আগেই চিঠি দিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গত ৫ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে সচিব ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজে বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাঠ্যবই মুদ্রণে ও সরবরাহ কাজকে সরকারি অতি জরুরি সেক্টর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারাও সার্বিক বিষয় সার্বক্ষণিতভাবে তদারকি করছেন।