করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে উচ্চ আয়ে কর ও সারচার্জের চাপও বাড়বে

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের জন্য ধাপে ধাপে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে সরকার। একই সাথে উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও বৃহৎ সম্পদের মালিকদের ওপর সারচার্জ আরোপ অব্যাহত রাখা হয়েছে। অন্য দিকে করপোরেট খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কিছু প্রণোদনা থাকলেও ব্যাংক, বীমা, মোবাইল অপারেটর ও তামাক কোম্পানিগুলোর জন্য উচ্চ করহার বহাল রাখা হয়েছে।

ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের জন্য নতুন কর কাঠামো

২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এর পরবর্তী ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

সরকার পরবর্তী বছরগুলোতে করমুক্ত আয়সীমা আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে এটি হবে ৪ লাখ টাকা , আর ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

নারী, প্রবীণ ও বিশেষ শ্রেণীর করদাতাদের জন্য বাড়তি সুবিধা

নারী করদাতা ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী নাগরিকদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা সাধারণ করদাতার তুলনায় বেশি রাখা হয়েছে।

২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ সালে : ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা

২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ সালে : ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা

২০৩০-৩১ সালে : ৫ লাখ টাকা

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা যথাক্রমে ৫ লাখ, ৫ লাখ ২৫ হাজার এবং ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উন্নীত হবে।

অন্য দিকে গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪-এ আহত গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

নতুন করদাতাদের জন্য স্বস্তি

করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে সাধারণভাবে ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে। তবে নতুন করদাতাদের ক্ষেত্রে এই ন্যূনতম কর মাত্র ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা করজালে নতুন মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার একটি উৎসাহমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য ৩৫ শতাংশ কর

২০২৮-২৯ করবর্ষ থেকে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য নতুন একটি কর স্তর যুক্ত হচ্ছে। ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে করহার ৩৫ শতাংশ হবে।

বর্তমানে সর্বোচ্চ করহার ৩০ শতাংশ হলেও নতুন কাঠামোতে অতি ধনী শ্রেণীর ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের মাধ্যমে আয় বৈষম্য কমানো এবং রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

সম্পদের ভিত্তিতে সারচার্জ বহাল

ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের ক্ষেত্রে সম্পদের ওপর সারচার্জের বিদ্যমান কাঠামো বহাল রাখা হয়েছে।

* ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত নিট সম্পদ : সারচার্জ নেই

* ৪ থেকে ১০ কোটি টাকা : ১০%

* ১০ থেকে ২০ কোটি টাকা : ২০%

* ২০ থেকে ৫০ কোটি টাকা: ৩০%

* ৫০ কোটি টাকার বেশি : ৩৫%

তবে শুধু সম্পদের পরিমাণ নয়, একজন করদাতার নামে একাধিক মোটরগাড়ি অথবা ৮ হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের গৃহসম্পত্তি থাকলেও ১০ শতাংশ সারচার্জ প্রযোজ্য হবে।

করপোরেট খাতে কারা কত কর দেবে

বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য করহার তুলনামূলক কম রাখা হয়েছে।

কমপক্ষে ১০% শেয়ার বাজারে ছেড়েছে এমন তালিকাভুক্ত কোম্পানি: ২২.৫%; সব লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে হলে : ২০%; অন্যান্য তালিকাভুক্ত কোম্পানি : ২৭.৫%; সব লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে হলে : ২৫%; অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানি : ২৭.৫%;

ব্যাংক, বীমা ও মোবাইল অপারেটরদের উচ্চ করহার

ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য করহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তালিকাভুক্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান: ৩৭.৫% অ-তালিকাভুক্ত: ৪০%

অন্য দিকে মোবাইল ফোন অপারেটর ও তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর ওপর ৪৫ শতাংশ কর বহাল রাখা হয়েছে। তবে মোবাইল অপারেটররা যদি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে নির্ধারিত পরিমাণ শেয়ার ছাড়ে, তাহলে করহার ৪০ শতাংশে নেমে আসবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন সারচার্জ

বাজেটের একটি নতুন দিক হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত না করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর ২.৫ শতাংশ সারচার্জ আরোপের প্রস্তাব। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় যদি বিদ্যমান আইন অনুযায়ী প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত না করে, তাহলে তাদের অর্জিত আয়ের ওপর এই অতিরিক্ত সারচার্জ দিতে হবে।

রাজস্ব আহরণ ও সামাজিক ন্যায়ের ভারসাম্য

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত কর কাঠামোতে নি¤œ ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য করমুক্ত সীমা বাড়ানো হয়েছে, আবার উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও বড় সম্পদের মালিকদের ওপর কর ও সারচার্জের চাপও বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সাথে প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের জন্য বিশেষ সুবিধা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রবেশগম্যতা-ভিত্তিক সারচার্জ সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির ফলে কতটা স্বস্তি মিলবে এবং উচ্চ করহারের কারণে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে কী প্রভাব পড়বে তা আগামী কয়েক বছরে বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।