বাড়তি খরচের চাপে সীমিত আয়ের মানুষ

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

বিদ্যুৎ ও এলপিজির মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ। আয় না বাড়লেও বিদ্যুৎ বিল, রান্নার গ্যাস, বাসাভাড়া ও বাজার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলছে না। প্রয়োজনীয় খরচ কমানো, সন্তানকে কাজে পাঠানো কিংবা স্বজনদের সহায়তা নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে অনেককে। এ অবস্থায় বাজারে সিন্ডিকেট ও সুশাসনের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে এবং পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে সীমিত আয়ের মানুষের সংসারে। মূল্য সমন্বয়ের সাথে বাড়ছে সংসারের ব্যয়, মিলছে না আয়-ব্যয়ের হিসাব। সিএনজি চালক জসিম জানান, পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে মাসে ১২ থেকে সাড়ে ১২ হাজার টাকা বাসাভাড়া দিতে হয়। আগে প্রায় এক হাজার ২০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল এলেও এখন এক হাজার ৮০০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত আসছে। রান্নার গ্যাসের খরচও বেড়েছে। তার ভাষ্য, গাড়ির জমাও ১০০ টাকা বেড়ে ৭৫০ টাকা হয়েছে।

বেসরকারি চাকরিজীবী জাফর বলেন, আগে তার মাসিক বিদ্যুৎ বিল এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা এলেও এখন দুই হাজার ৩০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আসছে। এতে মাসে প্রায় ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। সীমিত আয়ের পরিবারের জন্য এ বাড়তি খরচ বড় চাপ সৃষ্টি করছে বলে জানান তিনি। রাজধানীর জুরাইনে ১২ হাজার টাকা বেতনে গার্মেন্টে কাজ করেন পঞ্চাশোর্ধ্ব রেজিয়া বেগম। তার স্বামী রফিকুল ইসলাম নাইটগার্ডের কাজ করে পান ১০ হাজার টাকা। পুত্রবধূ ও দুই নাতিসহ ছয় সদস্যের পরিবারের দায়িত্ব তাদের ওপর। রফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন পরিবারের গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা খরচ হয়। ৫০০ টাকার বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যায় না। এর সাথে রয়েছে ৮ হাজার টাকা বাসাভাড়া ও বাড়তি বিদ্যুৎ বিল। তিনি বলেন, বর্তমান বাজারে তিন বেলা খেয়েপরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

খিলগাঁওয়ের সিপাহিবাগের রিকশাচালক আব্দুল খালেকের পরিবারেও একই সঙ্কট। জমা দেয়ার পর প্রতিদিন তার হাতে থাকে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। আর্থিক সঙ্কটের কারণে ১৪ বছর বয়সী ছেলেকে মাসে ছয় হাজার টাকা বেতনে ফার্নিচারের দোকানে কাজে দিতে হয়েছে। মাসে সাত হাজার টাকা বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, বাজারে সিন্ডিকেট ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হয়েছে। এতে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারলে পরিস্থিতি আরো সঙ্কটের দিকে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শিব্বির আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির েেত্র আন্তর্জাতিক বাজার ও ভর্তুকির বিষয়টি সামনে আনা হলেও বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত অদতা, ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিভিন্ন চুক্তির স্বচ্ছতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। তার মতে, এসব খাতে ব্যয় ও অপচয় কমানোর উদ্যোগ না নিয়ে সরাসরি ভোক্তার ওপর বাড়তি খরচ চাপালে এর বোঝা সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে।

তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজারে ‘কস্ট-পুশ’ প্রভাব তৈরি হচ্ছে। উচ্চ খাদ্যমূল্যস্ফীতি ও স্থবির আয়ের মধ্যে ঘনঘন মূল্য সমন্বয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে আরো চাপে পড়ছে। তাই মূল্যবৃদ্ধির আগে এর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন এবং তা মোকাবেলায় সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার মনে করেন এই বিশ্লেষক।

ড. শিব্বির আহমেদের মতে, বাজার তদারকি দুর্বল হলে প্রকৃত ব্যয়বৃদ্ধির তুলনায় ব্যবসায়ীরা বেশি হারে দাম বাড়ানোর সুযোগ পান। সরকার এক দিকে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে অন্য দিকে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো দ্বিমুখী চাপে পড়ে। তার মতে, ভোক্তার ওপর বাড়তি বোঝা চাপানোর আগে বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস ও অন্যান্য ব্যয়ের স্বচ্ছ অডিট করা এবং নিত্যপণ্যের বাজারে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

এ দিকে নিম্নআয়ের মানুষের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বাড়তি খরচ এখন আর আলাদা কোনো ব্যয় নয়; এটি পুরো সংসারের বাজেটে চাপ তৈরি করছে। খাবার, বাসাভাড়া, শিা ও জ্বালানির খরচ সামলাতে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। কারও সন্তানকে কাজে পাঠাতে হচ্ছে, আবার কেউ সংসার চালাতে স্বজনদের সহায়তার ওপর নির্ভর করছেন। আয় না বাড়িয়ে ব্যয়ের চাপ এভাবে বাড়তে থাকলে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় সঙ্কট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।