নয়া দিগন্ত ডেস্ক
হরমুজ প্রণালীতে ইরানি বন্দর ও দ্বীপগুলোতে মার্কিন বাহিনীর হামলার জবাবে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্দানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হেনেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং মজুদ কমে আসায় তেলের দাম আবারো বেড়েছে। নতুন এই সামরিক উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চীন, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া।
বুধবার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরে এবং কুয়েতে মার্কিন বিমান ঘাঁটি আলী আল সালেমে ড্রোন যোগে আক্রমণ চালিয়েছে। এর পাশাপাশি জর্দানে যুক্তরাষ্ট্রের আজরাক বিমান ঘাঁটিতে দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ২১টি লক্ষ্যে আক্রমণ চালিয়েছে। আর এগুলোর মধ্যে জর্দানে একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গারসহ চারটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা ইরানের জাম শহরের আকাশ থেকে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করারও দাবি করেছে।
সর্বশেষ উত্তেজনা বৃদ্ধির এই ঘটনাটি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্র তাদের একটি অ্যাপাচি অ্যাটকা হেলিকপ্টার ইরান গুলি করে ভূপাতিত করেছে অভিযোগ করার পর দেশটির কেশম দ্বীপ ও সংলগ্ন বন্দরগুলোতে হামলা চালানোর জেরে। তেহরান হরমুজ প্রণালীতে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার গুলি করে ভূপাতিত করেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনটি জানানোর পর ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় অনুযায়ী মঙ্গলবারের এই হামলার পর সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে সন্দেহ আরো গভীর হচ্ছে আর এতে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে লিখেছে রয়টার্স। সামাজিক মাধ্যম এক্স এ মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের এয়ার ডিফেন্স, গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন ও নজরদারি রেডার স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যস্থল করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই অভিযানকে সম্প্রতি মার্কিন বাহিনী ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর চালানো হামলার ‘আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া’ বলে বর্ণনা করেছে।
এবিসি নিউজকে ট্রাম্প বলেছেন, “আমি বিশ্বাস করি প্রতিক্রিয়াটি অত্যন্ত জোরালো, অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়া উচিত আর এটি তাই হয়েছে।” মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের স্থানীয় সময় বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে (ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা) আঘাত হানা শুরু হয় আর ভোররাত সাড়ে ৪টার আগে শেষ হয় (ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় রাত ৯টার আগে) ।
ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর কেশম দ্বীপ ও বন্দর শহর সিরিকে হামলা চালানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সূত্রগুলোকে উদ্ধৃত করে তারা জানায়, নিকটবর্তী বন্দর আব্বাসে ও পরে হরমুজ প্রণালীর প্রবেশ মুখের কাছে অবস্থিত জাস্ক কাউন্টিতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানের শীর্ষ যৌথ সামরিক কমান্ড খাতামুল-আম্বিয়াকে উদ্ধৃত করে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, এ হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্যস্থল করেছে ইরানি বাহিনী।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরে ড্রোনযোগে হামলা চালিয়েছে। শত্রুতা অব্যাহত থাকলে ‘আরো মারাত্মক জবাব’ দেয়ার হুমকি দিয়েছে তারা। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সতর্কতামূলক একটি সাইরেন বাজিয়ে জনগণকে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। এর কিছুক্ষণ পরই বাহরাইনের বাদশাহের এক গণমাধ্যম উপদেষ্টা এক্স এ এক পোস্টে দাবি করেন, তার এয়ার ডিফেন্স ইরানি হামলা প্রতিহত করেছে।
আলজাজিরা জানিয়েছে, ইরান বাহরাইনের পাশাপাশি কুয়েত ও জর্দানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেও হামলা চালানোর দাবি করেছে। এসব বিষয়ে পেন্টাগন তাৎক্ষণিকভাবে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি আর রয়টার্সও তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের এসব খবর যাচাই করতে পারেনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের একটি আত্মঘাতী ড্রোনের আঘাতে মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওই হেলিকপ্টারের দুই পাইলট আঘাত পাননি। তারা ‘ভালো’ আছেন। মঙ্গলবার এক ফোন কলে ট্রাম্প ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন যে হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনাটি ‘বড় কোনো ঘটনা নয়’ আর জোর দিয়ে বলেছেন, ‘পাইলটরা ভালো আছেন।’
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম এক সামরিক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় ইরানের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের নৌবাহিনীর একটি সারফেস ড্রোন (মানুষ্যবিহীন জলযান) ওমানের উপকূলে হেলিকপ্টারটির দুই ক্রুকে খুঁজে পেয়ে উদ্ধার করে।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোররাত প্রায় ৩টার দিকে মার্কিন সেনাবাহিনীর অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টারটি হরমুজ প্রণালীর কাছে ওমান উপকূলে টহল দেয়ার সময় সাগরে পড়ে বিধ্বস্ত হয়। সেন্টকম হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের কোনো কারণ জানায়নি। তারা শুধু জানিয়েছে, ঘটনার দুই ঘণ্টা পর ওই পাইলটদের উদ্ধার করা হয় আর তাদের শারীরিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল আছে। এটি ট্রাম্পের বর্ণনার চেয়ে আরো সতর্ক মূল্যায়ন।
তেলের দাম বৃদ্ধি : এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং মজুদ কমে আসায় তেলের দাম আবারো বেড়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। আগের সেশনে তেলের দাম গত সাত সপ্তাহের মধ্যে সর্বনি¤œ স্তরে নামলেও তেলের দাম আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রিনিচ মান সময় ভোর ৪টা ৬ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬৬ সেন্ট বা ০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৯২ দশমিক ১১ ডলারে পৌঁছেছে। অন্য দিকে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ৬০ সেন্ট বা ০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৮৮ দশমিক ৮০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিভিন্ন দেশের উদ্বেগ : নতুন এই সামরিক উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চীন, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া। ওয়াশিংটন ও তেহরানকে অনতিবিলম্বে উত্তেজনা বৃদ্ধি বন্ধ করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে চীন। বেইজিং দুই দেশের মধ্যকার এই বিপজ্জনক সামরিক সঙ্ঘাতের গতিপ্রকৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গতকাল চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে তাদের দেশের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বিবদমান উভয় পক্ষকে সম্পূর্ণ শান্ত থাকার এবং সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের তাগিদ দিয়েছেন। লিন জিয়ান দুই পরাশক্তিকে উত্তেজনা বাড়ায় এমন সব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ করেন।
এ ছাড়াও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। গতকাল রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অযৌক্তিক আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সঙ্ঘাতের নতুন ধাপ নিয়ে আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।’ উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দুই পক্ষেরই উচিত সামরিক হামলা অবিলম্বে বন্ধ করা এবং উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া।’
তেমনি যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের নতুন এই সামরিক উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ। গতকাল আনাদোলু এজেন্সির এক খবরে অস্ট্রেলিয়ার সরকারপ্রধানের এই আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। গণমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে অ্যালবানিজ চলমান এই যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে নিজের তীব্র শঙ্কার কথা জানান। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে মধ্যপ্রাচ্যের এই সঙ্ঘাত আরো বৃদ্ধি পেলে তার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি সমগ্র বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর আছড়ে পড়বে। অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের অনুলিপি অনুযায়ী তিনি স্পষ্ট করেছেন যে যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মানবিক সঙ্কটের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর যে বিশাল ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, তা পরিস্থিতিকে দিন দিন আরো বেশি অবনতির দিকে নিয়ে যাবে। অ্যালবানিজ এই অঞ্চলের চলমান বৈরিতা হ্রাস করার লক্ষ্যে তার সরকারের পক্ষ থেকে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন যে ক্যানবেরা সর্বদা এই রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতের একটি স্থায়ী প্রশমন দেখতে চায়। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে ভৌগোলিক দিক থেকে অস্ট্রেলিয়া মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করলেও এই যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে অনুভূত হতে শুরু করেছে।



